জাতীয়

আজ ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’ দিবস

প্রিন্ট
আজ ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’ দিবস
ছবি: সংগৃহীত

আজ ৫ আগস্ট। জুলাই বিপ্লবীদের ভাষায় ‘৩৬ জুলাই’। দুই বছর আগে এই দিনে ছাত্র-জনতার রক্তস্নাত গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেড় দশকের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আত্মত্যাগে অর্জিত সেই ঐতিহাসিক দিনটি আজ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্মরণ করছে দেশ।

রাষ্ট্রীয় ছুটি, শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধন, শহীদ পরিবারের সংবর্ধনা এবং বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে দিবসটি। তবে স্মরণের পাশাপাশি সামনে এসেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, যে স্বপ্ন ও প্রত্যাশা নিয়ে মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, সেই বাংলাদেশ কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে?

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে বিভিন্ন মহল বিভিন্ন নামে অভিহিত করে। কেউ বলেন ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’, কেউ ‘বর্ষা বিপ্লব’, আবার কারও কাছে এটি ‘দুনিয়া কাঁপানো জুলাই বিপ্লব’। ইতিহাস বিশ্লেষকদের মতে, সময় ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও এই আন্দোলনের ব্যাপকতা অনেকের কাছে বিশ্ব ইতিহাসের বড় বড় গণ-আন্দোলনের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।

বিশিষ্টজনদের মতে, স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে এমন গণআন্দোলন এবং তার পরিণতি অত্যন্ত বিরল। শত শত মানুষের আত্মত্যাগ শুধু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তনই ঘটায়নি, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা করেছে। এ ঘটনাপ্রবাহ আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান

দিবসটি উপলক্ষে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন।

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের আদর্শ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময়ের শাসনের অবসান এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক বিজয়। তাঁর ভাষায়, এই বিজয় ছাত্র-জনতার এবং এই ঐক্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

তিনি আরও বলেন, ১৯৭১ সাল ছিল স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ, আর ২০২৪ সাল ছিল স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকার রক্ষার সংগ্রাম। দুই সময়ের শহীদদের আত্মত্যাগ সমান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করার আহ্বান জানান তিনি।

শহীদদের আত্মত্যাগের মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো অসংখ্য মানুষের পরিবারের শোক আজও অমলিন। অনেক মা-বাবা সন্তান হারানোর বেদনা বয়ে বেড়াচ্ছেন। তাই শহীদদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন এবং তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নও রয়েছে।

এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, জুলাই যোদ্ধাদের ওপর হামলার ঘটনা এই আন্দোলনের চেতনার পরিপন্থী। তিনি নৈতিক সাহস নিয়ে জুলাইয়ের আদর্শ বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।

অন্যদিকে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, শহীদদের আত্মত্যাগকে অর্থবহ করতে হলে দেশকে সাম্প্রদায়িকতা, বৈষম্য ও শোষণমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে। তাঁর মতে, সেই লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত জুলাই আন্দোলনের চেতনা পূর্ণতা পাবে না।

সারা দেশে নানা কর্মসূচি

দিবসটি উপলক্ষে আজ দেশের ৬৪ জেলায় জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হচ্ছে। সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধন করেন। পরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।

এ ছাড়া দেশের সব জেলায় শহীদ পরিবারের সম্মাননা, আলোচনা সভা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রচনা, আবৃত্তি ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, আলোকচিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনীসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতেও রয়েছে বিশেষ আয়োজন।

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, দেশের সরকারি ও বেসরকারি জাদুঘরগুলো আজ বিনা টিকিটে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। সরকারি হাসপাতাল, কারাগার, শিশু পরিবার ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানে বিশেষ প্রীতিভোজের আয়োজনও রয়েছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি

দিবসটি উপলক্ষে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজ নিজ কর্মসূচি পালন করছে।

রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে বিকেলে ‘বর্ষা বিপ্লবের গান’ শীর্ষক কনসার্টের আয়োজন করেছে মুনসুন কালচারাল অ্যালায়েন্স। এতে দেশের জনপ্রিয় কয়েকটি ব্যান্ড ও সংগীতশিল্পীরা অংশ নেবেন।

এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী রাজধানীর পল্টনে সমাবেশ করছে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে দলটির উদ্যোগে সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হবে। অন্যদিকে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিও পৃথক আলোচনা সভার আয়োজন করেছে।

দুই বছর পরও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শুধু একটি স্মরণীয় দিন নয়, বরং আত্মত্যাগ, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশাকে ঘিরে জাতীয় আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে।

সম্পর্কিত সংবাদ