দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডে ১৮ বিদ্যালয়ে শূন্য পাস
৭৮ পরীক্ষার্থীর সবাই ফেল, শিক্ষকদের কাছে জবাব চেয়েছে বোর্ড—পাঠদানে অবহেলা, নাকি প্রতিষ্ঠানগুলোই অবহেলিত?
মোঃ জাকির হাসান জিমি
বিরামপুর উপজেলা প্রতিনিধি
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ
২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে থাকা ১৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠানে অংশ নেওয়া মোট ৭৮ জন পরীক্ষার্থীর সবাই অকৃতকার্য হয়েছে। এমন ফলাফল ঘিরে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও নানা আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এবং বর্তমান সরকার এর একটু হলেও ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে।
দিনাজপুর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান জনাব অধ্যাপক ইলিয়াস আহমেদ। তিনি বলেন দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফল কেন এমন হলো, তা জানতে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের কাছে জবাব চাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। বোর্ডের এমন উদ্যোগের পর এখন প্রশ্ন উঠেছে—এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের পাঠদানে কোনো ধরনের অবহেলা ছিল কি না, নাকি প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরেই নানা কারণে অবহেলিত?
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শূন্য পাস করা ১৮টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ঠাকুরগাঁও জেলায় রয়েছে সর্বোচ্চ ৫টি, কুড়িগ্রামে ৪টি, রংপুরে ২টি, গাইবান্ধায় ২টি, পঞ্চগড়ে ২টি, দিনাজপুরে ১টি, নীলফামারীতে ১টি এবং লালমনিরহাটে ১টি বিদ্যালয়।
ঠাকুরগাঁও জেলার ৫ বিদ্যালয়
আক্চা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা—পরীক্ষার্থী ৪ জন।
অনভারদিঘী উচ্চ বিদ্যালয়, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা—পরীক্ষার্থী ৭ জন।
মাধবপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা—পরীক্ষার্থী ৫ জন।
তৌরিগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা—পরীক্ষার্থী ৫ জন।
রামপুর ভাতুরিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, হরিপুর উপজেলা—পরীক্ষার্থী ৩ জন।
কুড়িগ্রাম জেলার ৪ বিদ্যালয়
তালতলা উচ্চ বিদ্যালয়, রাজারহাট উপজেলা—পরীক্ষার্থী ১২ জন।
পাথরডুবী আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ভুরুঙ্গামারী উপজেলা—পরীক্ষার্থী ৪ জন।
ব্রাহ্মণপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়, কুড়িগ্রাম—পরীক্ষার্থী ৪ জন।
পূর্ব কুমারপুর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা—পরীক্ষার্থী ১ জন।
রংপুর জেলার ২ বিদ্যালয়
কুমারপুর উচ্চ বিদ্যালয়, চতরা ইউনিয়ন, পীরগঞ্জ উপজেলা—পরীক্ষার্থী ১৮ জন।
ঘাসিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, চতরা ইউনিয়ন, পীরগঞ্জ উপজেলা—পরীক্ষার্থী ১৫ জন।
গাইবান্ধা জেলার ২ বিদ্যালয়
উত্তর দামোদরপুর কাজীপাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, সাদুল্লাপুর উপজেলা—পরীক্ষার্থী ৫ জন।
মনোহরপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, পলাশবাড়ী উপজেলা—পরীক্ষার্থী ৩ জন।
পঞ্চগড় জেলার ২ বিদ্যালয়
বোদা সরদারপাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বোদা উপজেলা—পরীক্ষার্থী ৩ জন।
বলরামহাট মডেল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বোদা উপজেলা—পরীক্ষার্থী ১ জন।
দিনাজপুর জেলার ১ বিদ্যালয়
গোলাপগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়, নবাবগঞ্জ উপজেলা—পরীক্ষার্থী ১৯ জন। শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এই বিদ্যালয়েই সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছে।
নীলফামারী জেলার ১ বিদ্যালয়
আম্বারী বহুমুখী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ডোমার উপজেলা—পরীক্ষার্থী ১০ জন।
লালমনিরহাট জেলার ১ বিদ্যালয়
এ এম রথবাড়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কালীগঞ্জ উপজেলা—পরীক্ষার্থী ৫ জন।
তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি
একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অংশ নেওয়া সব পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়া নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে কোনো কোনো বিদ্যালয়ে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে না পারায় প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদান, শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি এবং বিদ্যালয় পরিচালনার সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে শুধু ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষকদের অবহেলা বা কোনো অনিয়মকে চূড়ান্তভাবে দায়ী করার সুযোগ নেই। প্রকৃত কারণ বের করতে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক-শিক্ষার্থী উপস্থিতি, ক্লাস নেওয়ার রেকর্ড, অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার ফলাফল, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান কাঙ্ক্ষিত মানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারছে না। তাদের দাবি, শিক্ষা বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাদের সরেজমিনে তদন্ত করে প্রকৃত কারণ বের করতে হবে। যদি তদন্তে পাঠদানে অবহেলা বা দায়িত্ব পালনে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
এলাকাবাসীর আরও দাবি, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হয় এবং তদন্তে শিক্ষার পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনায় গুরুতর দুর্বলতা পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার মান উন্নয়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি বিদ্যালয়ের খারাপ ফলাফলকে শুধু শিক্ষার্থী বা শিক্ষক—কোনো এক পক্ষের ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। কারণ অনুসন্ধান করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান করা না গেলে প্রতিবছরই একই ধরনের ফলাফল ও হতাশার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।
দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১৮টি বিদ্যালয়ে একজন পরীক্ষার্থীও পাস না করার ঘটনা তাই শুধু ফলাফলের পরিসংখ্যান নয়; এটি ওইসব এলাকার শিক্ষা ব্যবস্থার মান, শিক্ষকতার জবাবদিহি এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। এখন বোর্ডের জবাব তলব ও পরবর্তী তদন্তে প্রকৃত কারণ কী উঠে আসে, সেদিকেই তাকিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।








