রাজনীতি

‘বাংলাদেশ কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, জনগণের’: পাটওয়ারী

প্রিন্ট
‘বাংলাদেশ কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, জনগণের’: পাটওয়ারী
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশকে সামরিক শাসন কিংবা কোনো ধরনের অগণতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে না নেওয়া, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার, চাঁদাবাজি-সন্ত্রাস বন্ধ, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি নিয়োগে দলীয় প্রভাব বন্ধসহ ১১ দফা দাবি জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে এসব দাবি তুলে ধরেন তিনি। একইসঙ্গে বাংলাদেশকেন্দ্রিক রাজনীতি, জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধান, দুর্নীতির অর্থ উদ্ধার এবং তরুণদের জন্য স্বচ্ছ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন এনসিপির এই নেতা।

পাটওয়ারীর ১১ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—

১. জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার:

হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত জুলাই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন পাটওয়ারী। তার ভাষ্য, বিচার ছাড়া প্রকৃত জাতীয় পুনর্মিলন সম্ভব নয়। তবে বিচার হতে হবে প্রমাণ, আইন ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে, প্রতিহিংসার ভিত্তিতে নয়।

২. চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস বন্ধ:

৫ আগস্টের পর যারা চাঁদাবাজি, দখলদারি, সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে জনগণকে হয়রানি করেছে, তাদের দল-মত নির্বিশেষে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। কোনো রাজনৈতিক দলের চাঁদাবাজ বা সন্ত্রাসীর আশ্রয়স্থল হিসেবে রাষ্ট্রকে ব্যবহার করা যাবে না বলেও উল্লেখ করেন।

৩. বাংলাদেশকেন্দ্রিক রাজনীতি:

দেশের রাজনীতিকে কোনো বিদেশি শক্তি, গোষ্ঠী বা অপশক্তির ওপর নির্ভরশীল না করার দাবি জানান পাটওয়ারী। তারেক রহমানসহ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে জনগণের কাছে জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার আহ্বান জানান তিনি।

৪. সন্ত্রাস ও পেশিশক্তির রাজনীতি পরিহার:

ক্ষমতায় যাওয়া কিংবা ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলদারি ও পেশিশক্তির ব্যবহার বন্ধের দাবি জানান পাটওয়ারী। বিএনপিকে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি, জবাবদিহি ও জনগণের ম্যান্ডেটের রাজনীতিতে ফিরে আসার আহ্বান জানান তিনি।

৫. গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্র সংস্কার:

গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়নে দ্রুত সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানান তিনি। প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও জনগণকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথাও বলেন।

৬. জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধান:

জ্বালানি সংকট নিরসনে দ্রুত দক্ষ ও স্বাধীন জাতীয় জ্বালানি কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন পাটওয়ারী। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দুর্নীতি, অপচয় ও অনিয়ম বন্ধ করে জনগণের কাছে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ন্যায্য ও সহনীয় মূল্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেন তিনি।

৭. সিন্ডিকেট ভেঙে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ:

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে সিন্ডিকেট, মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট বন্ধের দাবি জানান এনসিপির এই নেতা। কৃষক ও উৎপাদক যেন ন্যায্য দাম পান এবং ভোক্তারা সহনীয় মূল্যে পণ্য কিনতে পারেন, এমন কার্যকর বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।

৮. দলীয় নিয়োগ বন্ধ, মেধার মূল্যায়ন:

সরকারি নিয়োগে দলীয় পরিচয়, তদবির ও রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে যোগ্যতা, মেধা, দক্ষতা ও স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার দাবি জানান পাটওয়ারী। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী পুনর্বাসনের জায়গা না করার কথাও বলেন তিনি।

৯. দুর্নীতির অর্থ উদ্ধার:

রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট, দুর্নীতি ও অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি। প্রমাণিত অপরাধের ক্ষেত্রে জড়িতদের বিচার করে অবৈধ সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে ফিরিয়ে এনে তা দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের কল্যাণে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থায় ব্যবহারের আহ্বান জানান।

১০. তরুণদের জন্য স্বচ্ছ কর্মসংস্থান:

তরুণদের জন্য স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক ও ঘুষমুক্ত নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানান পাটওয়ারী। সরকারি ও বেসরকারি খাতে দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা তৈরি এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

১১. দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর:

শুধু তৈরি পোশাক শিল্প ও স্বল্পদক্ষ প্রবাসী শ্রমের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে দক্ষতা, প্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা ও উচ্চমূল্যের শিল্পনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার দাবি জানান তিনি।

এ ক্ষেত্রে আইটি, সফটওয়্যার, ইলেকট্রনিক্স, ওষুধ, আধুনিক কৃষি, মেশিনারি, জাহাজ নির্মাণ, প্রতিরক্ষা উৎপাদন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ উচ্চমূল্যের শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলেন পাটওয়ারী। বিদেশে শুধু শ্রমিক পাঠানোর পরিবর্তে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে বিশ্ববাজারে উচ্চমূল্যের সেবা ও পণ্য রপ্তানির ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

পাটওয়ারী বলেন, ‘সামরিক শাসন নয়, গণতান্ত্রিক শাসন। কর্তৃত্ববাদ নয়, জনগণের ক্ষমতা। চাঁদাবাজি নয়, আইনের শাসন। দলীয় নিয়োগ নয়, মেধার মূল্যায়ন। সিন্ডিকেট নয়, ন্যায্য বাজার।’

তিনি আরও বলেন, ‘দুর্নীতি নয়, জবাবদিহি। বিদেশের ওপর নির্ভরতা নয়, বাংলাদেশকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি। স্বল্পদক্ষ শ্রম নয়, দক্ষ মানবসম্পদ। প্রতিহিংসা নয়, ন্যায়বিচার এবং সবার ওপরে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।’

বাংলাদেশের সংকটের সমাধান কোনো এক ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর হাতে নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের সার্বভৌমত্ব, আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক সংস্কার, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্যেই সংকটের সমাধান রয়েছে।

সবশেষে পাটওয়ারী বলেন, ‘বাংলাদেশ কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, বাংলাদেশ জনগণের।’

সম্পর্কিত সংবাদ