মানুষের জীবনে চাহিদার শেষ নেই: খায়রুল আলম সুমন
এই কথাটি শুধু একটি সাধারণ পর্যবেক্ষণ নয়, বরং মানুষের স্বভাব, মনস্তত্ত্ব এবং সভ্যতার গতিপথ বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি মানুষের জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই তার প্রয়োজনের সূচনা হয় শিশুর প্রথম চাহিদা খাদ্য, স্নেহ ও নিরাপত্তা। সময়ের সাথে সাথে সে বড় হয়, তার জ্ঞান বাড়ে, অভিজ্ঞতা বাড়ে- আর সেই সঙ্গে বাড়তে থাকে তার চাহিদার পরিধি।প্রথমে মানুষ শুধু বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করে। এরপর সে চায় একটু স্বাছন্দ্য একটু ভালো থাক। কিন্তু মানুষ কখনো এক জায়গায় থেমে থাকে না। একটি চাহিদা পূরণ হলে আরেকটি নতুন চাহিদা তার সামনে এসে দাঁড়ায়। ছোট একটি ঘর পেলেই একসময় মনে হয়, আরও বড় ঘর দরকার; একটি চাকরি পেলেই মনে হয়, আরও ভালো চাকরি চাই; কিছু অর্থ উপার্জন করতে পারলেই মনে হয়, আরও বেশি সঞ্চয় করা দরকার।এই ধারাবাহিক চাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট শেষ নেই। এই চাহিদার বিস্তারকে আমরা দুইভাবে দেখতে পারি। একদিকে এটি মানুষের অগ্রগতির শক্তি। মানুষ যদি বেশি কিছু চাওয়ার সাহস না করত, তাহলে হয়তো আজকের এই উন্নত সভ্যতা গড়ে উঠত না।নতুন কিছু অর্জনের আকাঙ্ক্ষাই মানুষকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্প, সাহিত্যসহ নানা ক্ষেত্রে এগিয়ে নিয়ে গেছ। মানুষের স্বপ্ন, কল্পনা এবং চাহিদাই তাকে নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। কিন্তু অন্যদিকে, এই সীমাহীন চাহিদা মানুষকে অস্থিরও করে তোলে। যখন চাওয়া প্রয়োজনকে ছাড়িয়ে যায়, তখন তা লোভে পরিণত হয়। তখন মানুষ নিজের প্রাপ্তি নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারে না, অন্যের সঙ্গে তুলনা করে নিজের জীবনকে ছোট মনে করতে থাকে। এই তুলনা, এই অতৃপ্তি মানুষকে ভেতর থেকে ক্লান্ত করে দেয়। সুখ তখন দূরে সরে যায়, আর জীবনে তৈরি হয় এক ধরনের শূন্যতা।বর্তমান যুগে এই সমস্যাটি আরও প্রকট। প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভোগবাদী সংস্কৃতি- সবকিছু মিলিয়ে মানুষের চাহিদাকে ক্রমাগত উসকে দিচ্ছে। অন্যের সাফল্য, বিলাসী জীবনযাপন, বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে মানুষ নিজের জীবনকে কম মনে করে। ফলে চাহিদা আর প্রয়োজনের মধ্যে ব্যবধান আরও বেড়ে যায়।মানুষ যা আছে তা উপভোগ করার পরিবর্তে, যা নেই তার পেছনেই বেশি ছুটতে থাকে। আসলে মানুষের জীবনে চাহিদা থাকা স্বাভাবিক, বরং প্রয়োজনীয়ও। চাহিদা মানুষকে এগিয়ে যেতে শেখায়, পরিশ্রম করতে অনুপ্রাণিত করে। কিন্তু সেই চাহিদা যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।প্রয়োজন, ইচ্ছা এবং লোভ- এই তিনটির মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারা জীবনের বড় একটি শিক্ষা। যে মানুষ সীমিত চাহিদার মধ্যে নিজের জীবনকে সাজাতে পারে, সে তুলনামূলকভাবে বেশি শান্তিতে থাকে। কারণ সে জানে, জীবনের সবকিছু পাওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু যা আছে তা নিয়েই সুন্দরভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব।অন্যদিকে, যে মানুষ সবসময় আরও বেশি কিছু চায়, তার কাছে প্রাপ্তি কখনোই যথেষ্ট মনে হয় না। ফলে তার জীবনে অস্থিরতা বাড়তে থাকে। সন্তুষ্টি এখানে একটি বড় বিষয়। সন্তুষ্টি মানে এই নয় যে মানুষ কোনো উন্নতি করবে না বা স্বপ্ন দেখবে না।বরং এর অর্থ হলো- মানুষ নিজের অবস্থানকে বুঝে, কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করবে এবং সৎ উপায়ে নিজের উন্নতির জন্য চেষ্টা করবে। এই ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলেই জীবন হয়ে ওঠে অর্থবহ ও শান্তিময়। পরিবার, সমাজ এবং শিক্ষাব্যবস্থারও এখানে বড় ভূমিকা রয়েছে।ছোটবেলা থেকেই যদি মানুষকে শেখানো হয় প্রয়োজন ও চাহিদার পার্থক্য, কৃতজ্ঞতা, সংযম এবং নৈতিকতা- তাহলে সে বড় হয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবন গড়ে তুলতে পারে। অন্যথায়, সীমাহীন চাহিদার পেছনে ছুটতে গিয়ে মানুষ নিজের মানবিকতা ও মানসিক শান্তি হারিয়ে ফেলতে পারে।সবশেষে বলা যায়, মানুষের চাহিদার সত্যিই কোনো শেষ নেই। কিন্তু জীবনের আসল সাফল্য এই অন্তহীন চাওয়ার মধ্যে হারিয়ে যাওয়া নয়, বরং সেই চাওয়ার মাঝেও নিজের শান্তি, আনন্দ ও তৃপ্তিকে খুঁজে পাওয়া। যা আছে তাকে ভালোবাসা, যা নেই তার জন্য পরিশ্রম করা- এই দুইয়ের মধ্যে সঠিক ভারসাম্যই মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।