ঢাকা    বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

কেবল ভাষার মাসেই বাড়ে ‘সালাম নগর’ গ্রামের কদর

ভাষা আন্দোলনের অন্যতম শহীদ আবদুস সালাম, যিনি সালাম নামে পরিচিত, তাঁর গ্রামের বাড়ি ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার লক্ষ্মণপুর (বর্তমানে সালাম নগর) গ্রামে। প্রান্তিক জনপদ হওয়ায় সারা বছর শহীদ সালামের পরিবার ও এলাকার তেমন খোঁজ কেউ রাখে না। তবে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি এলেই গ্রামটির কদর বেড়ে যায়। এ সময় সেখানে যান দেশের বিশিষ্টজন, গণমাধ্যমকর্মী ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।মামার নামে এ গ্রামের নাম সালাম নগর করা হলেও সারা বছর সেখানে মানুষের উপস্থিতি কম বলে জানান শহীদ সালামের ভাগিনা মো. হানিফ। তিনি বলেন, শুধুমাত্র ফেব্রুয়ারি এলেই সবাই তাদের খোঁজ নেন ও কর্মসূচি পালন করেন। এখানে একটি বিনোদন পার্ক ও উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এতে একদিকে গ্রামের সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা বাড়বে, অন্যদিকে গ্রন্থাগারের পাঠকসংখ্যাও বাড়বে এবং মানুষ ভাষা আন্দোলন ও শহীদ সালাম সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে।ভাষা শহীদ সালামের নামে গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হলেও সেখানে বছরজুড়ে সুনসান নীরবতা বিরাজ করে। স্থানীয়রা মনে করেন, আগামী প্রজন্মকে ভাষা শহীদ সালাম সম্পর্কে জানাতে তাঁর জীবন ও অবদান পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। পাশাপাশি গ্রামের বাড়ির সামনে উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপন, তোরণ নির্মাণ, গ্রন্থাগারে নতুন বই সংযোজন এবং একটি বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলার দাবিও জানান তারা। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর দাবিও তুলেছেন বিশিষ্টজনরা।১৯২৫ সালের ২৭ নভেম্বর লক্ষ্মণপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ভাষা শহীদ আবদুস সালাম। বাংলা ভাষা রক্ষার আন্দোলনে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন তিনি। এ সময় গুলিবিদ্ধ হন আবদুস সালাম। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ এপ্রিল তিনি মৃত্যুবরণ করেন এবং তাঁকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরিবারের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ভাষা আন্দোলনের ৬৫ বছর পর ২০১৭ সালে আজিমপুর কবরস্থানে তাঁর কবর শনাক্ত করা হয়।ভাষা শহীদ আবদুস সালামকে স্মরণীয় করে রাখতে তাঁর গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মণপুরের নাম পরিবর্তন করে ‘সালাম নগর’ রাখা হয়েছে। সালামের বাড়ির সামনে লক্ষ্মণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ভাষা শহীদ আবদুস সালাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ২০০০ সালে ফেনীতে ভাষা শহীদ সালাম স্টেডিয়াম নামকরণ করা হয় এবং ২০০৭ সালে দাগনভূঞা উপজেলা অডিটরিয়ামের নামকরণ করা হয় ভাষা শহীদ সালাম মিলনায়তন।২০০৮ সালে সালামের বাড়িতে নির্মাণ করা হয় ভাষা শহীদ আবদুস সালাম গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের নামকরণ করা হয়েছে তাঁর নামে। কাশেম-গোল আরা-রাকিন কল্যাণ ট্রাস্টের স্বত্বাধিকারী আবুল কায়েশ রিপন ২০১৭ সালে সালামের গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন ভাষা শহীদ সালাম মেমোরিয়াল কলেজ। এছাড়া তাঁকে স্মরণীয় করে রাখতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধজাহাজের নাম রাখা হয়েছে ‘বানৌজা সালাম’। সরকারের পক্ষ থেকে ২০০০ সালে ভাষা শহীদ সালামকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হয়।সরেজমিনে ভাষা শহীদ সালাম স্মৃতি পাঠাগার ও জাদুঘরে গিয়ে দেখা যায়, গ্রন্থাগারের আলমারিতে হাজার হাজার বই সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো রয়েছে। পরিপাটি এ গ্রন্থাগারে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও কোনো পাঠকের দেখা মেলেনি। লাইব্রেরিয়ান লুৎফর রহমান বাবলু জানান, গ্রন্থাগারে সাড়ে তিন হাজার বই রয়েছে, যার বেশিরভাগই পুরোনো। বছরজুড়ে গ্রন্থাগারটি খোলা থাকলেও পাঠকের আনাগোনা কম।শহীদ আবদুস সালামের ভাতিজা নুরে আলম জানান, জাদুঘরের পাশ দিয়েই ফেনী-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়ক গেছে। সড়কের পাশে ভাষা শহীদ আবদুস সালামের নামে একটি তোরণ নির্মাণ করা হলে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও তাঁর নাম আরও বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকবে।শহীদ সালামের ভাগিনা মো. হানিফ বলেন, মামার নামে এ গ্রামের নাম সালাম নগর করা হয়েছে, কিন্তু সারা বছর এখানে কেউ আসে না। শুধু ফেব্রুয়ারি এলেই সবাই তাদের খোঁজ নেন। তিনি মনে করেন, এখানে বিনোদন পার্ক ও উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলে গ্রামের সঙ্গে মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়বে এবং গ্রন্থাগারেও পাঠকের উপস্থিতি বৃদ্ধি পাবে।ভাষা শহীদ আবদুস সালাম স্মৃতি পরিষদের সভাপতি সাংবাদিক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন বলেন, ভাষা আন্দোলনের গৌরবগাঁথা ও ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। সালামদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলা ভাষা দেশের সর্বস্তরে চালু করার উদ্যোগ নেওয়ার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে সালাম নগরে বছরজুড়ে জনসমাগম নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানান তিনি।ফেনী জেলা প্রশাসক আবু সেলিম মাহমুদ উল হাসান বলেন, ভাষা শহীদ সালামের গ্রামের সঙ্গে আগামী প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কেবল ভাষার মাসেই বাড়ে ‘সালাম নগর’ গ্রামের কদর