ঢাকা    বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ছে, মান কতটা?

মানব মনস্তত্বে সংখ্যার আধিক্য সবসময় কল্যাণকর বলে মনে হলেও, সংখ্যা কখনো কখনো বিভ্রান্তিকর হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে সেই সংখ্যাটি যদি একটি দেশের বিরাজমান বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট হয়।একটি দেশের অভ্যন্তরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও উচ্চশিক্ষার মান কতটা এগোচ্ছে সেটাই মূলত ধর্তব্যের বিষয়। দেশের জ্ঞানভিত্তিক অগ্রগতি কখনোই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না। বরং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কেমন মানের গবেষণা হচ্ছে, কত কত উদ্ভাবন জন্ম নিচ্ছে, আর কতটা দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হচ্ছে তার ওপর সামগ্রিক সফলতার হিসাবনিকাশ নির্ভর করে। আর এই হিসাবের খাতা খুললেই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ছবিটা অনেক বেশি জটিল হয়ে ওঠে।শুধু রংপুর শহরের কেন্দ্রস্থলে ১২০ কিলোমিটারের ব্যাসার্ধের মধ্যেই চোখে পড়বে একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়। কোথাও নতুন ক্যাম্পাসের ভিত্তিপ্রস্তর, কোথাও অস্থায়ী ভবনে শুরু হওয়া শিক্ষা কার্যক্রম, কোথাও আবার নির্মাণাধীন এক স্বপ্নের গল্প। সংখ্যার হিসাবে এটি নিঃসন্দেহে এক অগ্রগতির চিত্র। কিন্তু প্রশ্ন হলো--এই অগ্রগতি কি সত্যিই উচ্চশিক্ষার, নাকি কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের নামফলকের? এক দশকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতাগত এক দশকে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রবণতা অভূতপূর্বভাবে বেড়েছে। রাজধানীকেন্দ্রিক উচ্চশিক্ষার সুযোগের বিকেন্দ্রীকরণ, আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং শিক্ষার্থীদের দোরগোড়ায় উচ্চশিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার যুক্তি সামনে রেখে অহরহ নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য মোতাবেক, এখন দেশে ১৫৭টিরও অধিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে বেসরকারি ও পাবলিক মিলিয়ে।কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে কি সমানতালে বেড়েছে গবেষণা? মানসম্পন্ন শিক্ষক, আধুনিক ল্যাবরেটরি কিংবা আবাসন সুবিধা? নাকি আমরা এমন এক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছি, যেখানে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও জ্ঞানের গভীরতা ক্রমশ কমে যাচ্ছে?বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি ক্যাম্পাস, কয়েকটি ভবন বা প্রশাসনিক কাঠামোর নাম নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের আঁতুড়ঘর। অথচ দেশের বহু নবপ্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তবতা এই প্রত্যাশিত চিত্র থেকে যোজন যোজন দূরত্বে অবস্থান করছে। উত্তরাঞ্চলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জটলাউত্তরাঞ্চলের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকট, আবাসন সংকট এবং গবেষণা অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করছে। এখানকার বহু শিক্ষার্থী এখনও আবাসিক সুবিধার বাইরে। গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় ল্যাব, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কিংবা পর্যাপ্ত গবেষণা তহবিল অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রতুল।এমন পরিস্থিতিতে একই অঞ্চলে নীলফামারী কিংবা ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। কারণ একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা মানে শুধু একটি নিছক ঘোষণা নয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকে ভূমি অধিগ্রহণ, অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণাগার স্থাপন, আবাসিক হল, গ্রন্থাগার এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের মতো বিশাল দায়বদ্ধতা। মানের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার দাবিশিক্ষাবিদদের ভাষায়, বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের শক্তির মূল উৎস সংখ্যা নয়, মান। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেডস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বজুড়ে পরিচিত হতে পেরেছে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং একাডেমিক উৎকর্ষতার জন্য। এসব প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে এগিয়ে থাকার পেছনে তাদের ভবনের সংখ্যা নয়; বরং গবেষণা সংস্কৃতি, দক্ষ শিক্ষক এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কাজ করেছে।বাংলাদেশেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। দেশের উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিক অবস্থান এখনও সীমিত। গবেষণা প্রকাশনা, সাইটেশন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আকর্ষণ কিংবা উদ্ভাবনের সূচকে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় প্রত্যাশিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে, আরও নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি কি বেশি জরুরি নয়?বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চশিক্ষার প্রকৃত উন্নয়ন ঘটে যখন একটি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের স্রেফ ডিগ্রি প্রদানের বদলে দক্ষতা, গবেষণার সুযোগ এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জনের সুযোগ করে দেয়। কিন্তু যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পর্যাপ্ত শিক্ষক ছাড়াই চালু হয়, গবেষণার জন্য বরাদ্দ নগণ্য থাকে, শিক্ষার্থীরা মৌলিক সুবিধা থেকেই বঞ্চিত হয়, তবে সেই প্রতিষ্ঠান কাগজে বিশ্ববিদ্যালয় হলেও বাস্তবে তার কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়ে।তবে, জেলাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে শক্তিশালী যুক্তিও রয়েছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থী অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণে দূরের শহরে পড়তে যেতে পারে না। স্থানীয়ভাবে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। ফলে বিতর্কটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে নয়; বরং প্রশ্নটি হলো, আমরা সংখ্যার বিস্তারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিবর্তেমানসম্মত প্রতিষ্ঠান গঠনের দিকে বেশি মনোযোগ দেব কি-না? শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়ারাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) গণিত বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ইশরাত উল্লাহ নামকাওয়াস্তে দেশে ভুরি ভুরি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলাকে ভুল সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন।তার ভাষায়, আমি মনে করি এটা সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। কারণ আমাদের উচিত যেসব বিশ্ববিদ্যালয় আছে সেগুলোর ক্যাম্পাস ও পড়ার মান সম্প্রসারণ করা আগে জরুরি।পাশাপাশি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা ও পড়াশোনার মান আরো বৃদ্ধিতে দক্ষ লোকবল নিয়োগ এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন তিনি। শিক্ষকরা যা বলছেনবেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শ দপ্তর এবং গবেষণা ও সম্প্রসারণ দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. ইলিয়াছ প্রামাণিকের চোখে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যার চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মানই সর্বদা গুরুত্ব পাওয়া উচিত।ড. ইলিয়াছ প্রামাণিক বলেন: ❝পাইকারি দরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা না করে বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধ্যয়ন ও গবেষণার মান আগে নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের প্রাধান্যের বস্তু হতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান; সংখ্যা নয়।❞গবেষণাকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান যাচাইয়ের প্রধান “প্যারামিটার” আখ্যা দিয়ে প্রামাণিক বলেন, একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে রিসার্চ গ্র্যান্ট (গবেষণা অনুদান), ফ্যাকাল্টি মেম্বারদের দক্ষতা এবং অপ্রতুলতার দিকে নজর দিতে হবে। এতে করে বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান উন্নয়ন করা আরও সহজতর হবে বলে মনে করেন তিনি। শেষ কথামূলত, একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা তুলনামূলক সহজ হলেও একটি সেটিকে জ্ঞানের আলোকস্তম্ভে পরিণত করা কঠিন। কেননা ভবনের সংখ্যা বাড়ানো যায় কয়েক বছরের মধ্যেই, কিন্তু গবেষণার সংস্কৃতি, একাডেমিক ঐতিহ্য এবং আন্তর্জাতিক মান গড়ে তুলতে লাগে কয়েক দশক। তাই আমাদের প্রশ্ন রাখা উচিত: আমরা কি সত্যিই বিশ্ববিদ্যালয় গড়ছি, নাকি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড? কেননা উচ্চশিক্ষার ইতিহাস শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাকে নয়, তার সৃষ্ট জ্ঞানকেই মনে রাখে।লেখক: সামিহা ফেরদৌসী, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।#আরইউএস

বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ছে, মান কতটা?