দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে আলোচনায় এসেছে পারমাণবিক জ্বালানি বা নিউক্লিয়ার ফুয়েল। তেল, গ্যাস বা কয়লার মতো প্রচলিত জ্বালানির পরিবর্তে এখানে ব্যবহৃত হচ্ছে ইউরেনিয়াম, যা থেকে অত্যন্ত উচ্চমাত্রার শক্তি উৎপন্ন হয়। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রূপপুরের চুল্লিতে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোড করার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার পথে অগ্রসর হয়েছে।পারমাণবিক জ্বালানির মূল উপাদান হলো ইউরেনিয়াম-২৩৫ সমৃদ্ধ ছোট ছোট ধাতব পেলেট। আকারে ক্ষুদ্র হলেও এর শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা অত্যন্ত বেশি। কয়েকশো এমন পেলেট একটি সিল করা ধাতব টিউবে রাখা হয়, যাকে ফুয়েল রড বলা হয়। একাধিক ফুয়েল রড একত্রে যুক্ত হয়ে তৈরি হয় ফুয়েল অ্যাসেম্বলি। একটি ফুয়েল অ্যাসেম্বলির দৈর্ঘ্য সাধারণত সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে।রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি চুল্লিতে মোট ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি ব্যবহার করা হবে। এই জ্বালানি খনির আকরিক থেকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিশোধিত ও সমৃদ্ধ করে প্রস্তুত করা হয়।পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল প্রক্রিয়া হলো নিউক্লিয়ার ফিশন বা বিভাজন বিক্রিয়া। চুল্লির ভেতরে ইউরেনিয়াম নিউক্লিয়াসে নিয়ন্ত্রিতভাবে বিভাজন ঘটানো হয়, যার ফলে বিপুল পরিমাণ তাপশক্তি উৎপন্ন হয়। এই তাপশক্তি দিয়ে পানি বাষ্পে পরিণত করা হয়, যা টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে। পুরো প্রক্রিয়াটি একটি নিয়ন্ত্রিত চেইন রিঅ্যাকশনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক জ্বালানি থেকে উৎপন্ন শক্তি প্রচলিত কয়লা, গ্যাস বা তেলের তুলনায় বহুগুণ বেশি। মাত্র কয়েক গ্রাম ইউরেনিয়াম থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়, তার জন্য কয়লা বা গ্যাসের প্রয়োজন হয় কয়েকশো গুণ বেশি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মাত্র সাড়ে চার গ্রাম ইউরেনিয়াম পেলেট থেকে যে শক্তি পাওয়া যায়, তার সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় ৪০০ কেজি কয়লা বা ৩৬০ ঘনমিটার গ্যাস প্রয়োজন হতে পারে।পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি সরাসরি কার্বন নিঃসরণ করে না, ফলে পরিবেশ দূষণ তুলনামূলকভাবে কম। এ কারণে এটিকে অনেক সময় পরিচ্ছন্ন ও দীর্ঘমেয়াদি শক্তির উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়।রূপপুর প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় যুক্ত হতে যাচ্ছে। চুল্লিতে জ্বালানি স্থাপন সম্পন্ন হলে তাপ উৎপাদন শুরু হবে, এরপর সেই তাপ ব্যবহার করে বাষ্প তৈরি, টারবাইন ঘূর্ণন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের পূর্ণ প্রক্রিয়া শুরু হবে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি দেশের বিদ্যুৎ খাতে একটি বড় মাইলফলক হলেও এর নিরাপত্তা, ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে পারমাণবিক শক্তি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।