ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

জাতীয়

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে জ্বালানি ব্যবস্থায় বহুমুখী চাপ

দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট একে অন্যকে আরও তীব্র করে তুলছে। গ্যাসের ঘাটতিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পকারখানা নির্ভর করছে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর। এতে শিল্পাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় ডিজেলের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়েছে। কিন্তু চাহিদার সঙ্গে সরবরাহ না বাড়ায় কোথাও কোথাও ডিজেলের নীরব ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। ফলে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও ডিজেল তিন জ্বালানির সংকট এখন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শিল্প, পরিবহন ও নাগরিক জীবনে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিদুর্ঘটনার পর গত ২১ জুলাই থেকে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে দেশে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকটের সূত্রপাত হয়। বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা, সিএনজি স্টেশন সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ে। কোথাও কারখানার উৎপাদন কমেছে, কোথাও বন্ধ রাখতে হয়েছে যন্ত্রপাতি। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় রাজধানীর অনেক এলাকায় রান্নার জন্য লাকড়ির চুলার ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। অনেক মানুষকে হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে খাবার কিনে খেতে হয়েছে।এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা লোডশেডিংয়ের চাপ এতদিন মূলত ঢাকার বাইরের গ্রাহকদের ওপর বেশি থাকলেও এখন রাজধানীতেও তা স্পষ্ট। ১২ আগস্ট রাত থেকে সরকারি নির্দেশনায় ঢাকায় লোডশেডিং শুরু হয়। কোনো কোনো এলাকায় দিনে একবার সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ বন্ধ রাখার পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে বহু এলাকায় একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। বৃষ্টি হলে চাহিদা কমে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হচ্ছে; আবার গরম বাড়লে লোডশেডিংও বাড়ছে।সরকারি হিসাবে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। তবে খাতসংশ্লিষ্টদের মতে প্রকৃত চাহিদা ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার সঙ্গে বিদ্যমান সরবরাহের ব্যবধান বিপুল। পেট্রোবাংলার সর্বশেষ তথ্যও পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২৫ আগস্ট দুপুর ২টায় দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২৩৮ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া যায় ১৬১ কোটি ৬০ লাখ এবং এলএনজি থেকে ৭৬ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট। ২৬ আগস্ট দুপুর ১২টায় সরবরাহ সামান্য বেড়ে ২৪১ কোটি ঘনফুটে উঠলেও এরপর আবার কমতে থাকে। ২৭ আগস্ট বিকেল ৪টায় মোট সরবরাহ নেমে আসে ২৩৫ কোটি ৪০ লাখ এবং এলএনজি ৭৩ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুটে। ২৮ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টায় মোট সরবরাহ আরও কমে দাঁড়ায় ২৩৩ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট। এ সময় দেশীয় গ্যাস ছিল ১৬১ কোটি ৬০ লাখ এবং এলএনজি ৭২ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট। অর্থাৎ ২৬ আগস্টের তুলনায় দুই দিনে মোট গ্যাস সরবরাহ কমেছে ৭ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট; শুধু এলএনজি সরবরাহ কমেছে ৬ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট।এ অবস্থায় শিল্পকারখানায় গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বরাদ্দ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে দৈনিক প্রায় ৯৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হলেও তা কমিয়ে ৭৫ কোটি ঘনফুট করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সাশ্রয় হওয়া প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস শিল্পে দেওয়ার কথা। কিন্তু এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গ্যাস কম পাওয়ায় অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সংকট আবার শুধু গ্যাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কয়লা ও জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঘাটতিও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। বৃহস্পতিবার ২৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি তেলের সরবরাহে ঘাটতি ছিল। প্রায় সাত হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার আটটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থাকলেও ওই দিন এসব কেন্দ্র থেকে উৎপাদন হয়েছে পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের কম। পায়রার একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটিতে, মাতারবাড়ীর একটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণে এবং বড়পুকুরিয়ার দুটি ইউনিট ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে। কয়লা সরবরাহে বিঘ্নের কারণে আদানির কেন্দ্রও ৭ আগস্ট থেকে উৎপাদন কমিয়েছে। দিনের বেলায় কেন্দ্রটি প্রায় ৯০০ এবং সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে।সব মিলিয়ে বৃহস্পতিবার গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলের সংকটে ৬২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে জাতীয় গ্রিডে। বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান দ্রুত বাড়ছে। ২৪ আগস্ট দিনের বেলায় সর্বোচ্চ ঘাটতি ছিল ১ হাজার ১৯৩ মেগাওয়াট। ২৫ আগস্ট বিকেল ৩টায় তা বেড়ে ২ হাজার ২৫৯ মেগাওয়াট এবং ২৬ আগস্ট রাত ১২টায় ২ হাজার ৮২৮ মেগাওয়াটে পৌঁছে। বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় সর্বোচ্চ ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াট। রাতেও ঘাটতি ছিল তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি। রাত ১টায় চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ১৭১ মেগাওয়াট, সরবরাহ ১৩ হাজার ৯২৭ মেগাওয়াট; ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট। রাত ৩টায় ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৯০ মেগাওয়াট। পরদিন ভোর ৪টায় ২ হাজার ৯১৫ এবং সকাল ৬টায় ২ হাজার ৬৩৬ মেগাওয়াট ঘাটতি ছিল। বিকেল ৩টায় ঘাটতি কিছুটা কমে ১ হাজার ৪৮৩ মেগাওয়াটে নেমে আসে।বিদ্যুৎ না থাকায় শিল্পকারখানাগুলো উৎপাদন সচল রাখতে ডিজেলচালিত জেনারেটরের দিকে ঝুঁকছে। একইভাবে ব্যক্তিগত পর্যায়েও জেনারেটরের ব্যবহার বেড়েছে। ফলে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় ডিজেলের চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বলছে, চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সরবরাহ বাড়ানো হয়নি। এতে বিভিন্ন অঞ্চলে তৈরি হয়েছে ডিজেলের নীরব ঘাটতি।শুক্রবার বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যানকে দেওয়া চিঠিতে সংগঠনটির আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল চাহিদা অনুযায়ী সারা দেশে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জানান, মন্ত্রী, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও বিপিসি চেয়ারম্যানকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় হোয়াটসঅ্যাপে চিঠি পাঠানো হয়েছে; অফিস খুললে সরাসরি চিঠি দেওয়া হবে। চিঠিতে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ ঘাটতির পাশাপাশি দেশের মোট গ্যাসের চাহিদার প্রায় ২৫ শতাংশ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বড় শিল্পকারখানা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিকল্প বিদ্যুৎ হিসেবে ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, ঢাকা বিভাগে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ডিজেলের চাহিদা প্রায় ১০ থেকে ১২ গুণ বেড়েছে।তবে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহের পরিবর্তে বিপণন কোম্পানিগুলোকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল সরবরাহের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ সংগঠনটির। নির্ধারিত পরিমাণের বেশি জ্বালানি সরবরাহ করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে দায়ী করা হবে—এমন নির্দেশনার কারণে অনেক পাম্প প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজেল মজুত করতে পারছে না। বিশেষ করে গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ার মতো শিল্পাঞ্চলঘন এলাকায় পরিস্থিতি বেশি সংকটপূর্ণ।সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল বলেন, আগে যেসব পাম্পে দৈনিক চার থেকে পাঁচ হাজার লিটার ডিজেলের চাহিদা ছিল, সেখানে এখন তা বেড়ে প্রায় ২০ হাজার লিটারে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি গাড়ি এলে সাড়ে চার হাজার লিটার তেল দেওয়া হচ্ছে এবং পরের দিন আবার আসতে বলা হচ্ছে। ফলে পাম্পগুলোকে রেশনিং করে গ্রাহকদের জ্বালানি দিতে হচ্ছে। এতে তাদের মজুতও আগের তুলনায় কমে গেছে।তিনি অভিযোগ করেন, নীতিনির্ধারকেরা মাঠের বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে নির্ধারিত সরবরাহের সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন। তাঁর মতে, লোডশেডিং বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জেনারেটরের ব্যবহার ও ডিজেলের চাহিদা বাড়াটাই স্বাভাবিক। তাই চাহিদা বাড়লে সরবরাহও বাড়াতে হবে। ডিজেল সরবরাহ সীমিত থাকায় শিল্পাঞ্চলগুলোতে জ্বালানি কেনা নিয়ে এক ধরনের ‘প্যানিক’ তৈরি হয়েছে বলেও দাবি করেছে পাম্প মালিকদের সংগঠন। চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত সরবরাহ বাড়ানো না হলে এই পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে শিল্প উৎপাদন, পণ্য পরিবহন এবং বাজারব্যবস্থায়।বর্তমান পরিস্থিতি তাই বিচ্ছিন্ন কোনো গ্যাস বা বিদ্যুৎ সংকট নয়। বরং গ্যাসের ঘাটতি বিদ্যুৎ উৎপাদন কমাচ্ছে, বিদ্যুৎ সংকট শিল্পকে জেনারেটরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, আর জেনারেটরের বাড়তি ব্যবহার ডিজেলের ওপর চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে কয়লা ও জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকট বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প পথও সীমিত করে দিয়েছে। ফলে গ্যাস-বিদ্যুৎ-ডিজেল-শিল্প উৎপাদন পুরো জ্বালানি ব্যবস্থাই এখন একটি আন্তঃসংযুক্ত চাপের মধ্যে পড়েছে।এ পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দিতে এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক করা, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস-তেল-কয়লার সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বাড়তি ডিজেল চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিতরণব্যবস্থা সমন্বয় করা জরুরি। তা না হলে সাময়িক জ্বালানি সংকট ধীরে ধীরে শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, মূল্যস্ফীতি ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর দীর্ঘস্থায়ী চাপ তৈরি করতে পারে।

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে জ্বালানি ব্যবস্থায় বহুমুখী চাপ