ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

তারুণ্যের মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তিতে মাতলো কিশোরগঞ্জ, বিজকেস কেআইইউ ২০২৬ -এর চ্যাম্পিয়ন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বেবি শার্কস।

শ্রেনিকক্ষের চার দেয়াল পেরিয়ে বাস্তব বিশ্বের জটিল ব্যবসায়িক সংকটের সমাধান খোঁজার এক অনন্য মঞ্চে পরিণত হয়েছিল কিশোরগঞ্জ। কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সক্রিয় সংগঠন 'অ্যাকাউন্টিং উইজার্ড ক্লাব'-এর উদ্যোগে আয়োজিত জাতীয় পর্যায়ের ব্যবসায়িক কেস সমাধান প্রতিযোগিতা ‘বিজকেস, কেআইইউ ২০২৬’ (BizzCase, KiU 2026)-এর পর্দা নামলো এক জমকালো গ্র্যান্ড ফাইনালের মধ্য দিয়ে। দেশের বিভিন্ন খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের বুদ্ধিভিত্তিক লড়াইয়ে সেরা হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দল ‘বেবি শার্কস’।​রবিবার (২৩ আগস্ট) কিশোরগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তনে এক উৎসবমুখর ও প্রাণবন্ত পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় এই প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব। সকাল থেকেই শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বিরাজ করছিল তুমুল উদ্দীপনা ও প্রতিযোগিতামূলক আবহ। দিনব্যাপী এই আয়োজনে তরুণেরা তাদের বিশ্লেষণী দক্ষতা, কৌশলগত চিন্তাধারা এবং ব্যবসায়িক বিচক্ষণতার দুর্দান্ত প্রদর্শন করেন।​একবিংশ শতাব্দীর দ্রুত পরিবর্তনশীল কর্পোরেট বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি বাস্তবমুখী দক্ষতার কোনো বিকল্প নেই। তরুণ প্রজন্মের মাঝে গভীর ব্যবসায়িক জ্ঞান, সূক্ষ্ম বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সংকট সমাধানের দক্ষতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতা এবং উদ্ভাবনী চিন্তাধারার বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্য নিয়েই ‘অ্যাকাউন্টিং উইজার্ড ক্লাব’ এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে।​দেশজুড়ে প্রথম পর্বের কঠিন ধাপগুলো পেরিয়ে চূড়ান্ত পর্বে লড়াইয়ের সুযোগ পায় আটটি শক্তিশালী দল। গ্র্যান্ড ফাইনালে স্থান করে নেওয়া দলগুলো হলো—​কাইজেন, ​ফাঁকিবাজ, ​হেভেনলি ডেমন ডিভাইন কাল্ট, ব্রেকিং টিথ, টিম অ্যাংকরেজ, টিম উন্নয়ন, ইগনাইট এবং ​বেবি শার্কস।​চূড়ান্ত পর্বে প্রতিযোগীদের সামনে উপস্থাপন করা হয় বাস্তবভিত্তিক এক জটিল ব্যবসায়িক সমস্যা। দলগুলোকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেই কেসের গভীর বিশ্লেষণ করে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে কার্যকর, টেকসই এবং বাস্তবায়নযোগ্য সমাধান প্রস্তুত করতে হয়। প্রতিটি দল অত্যন্ত সাবলীল ও দৃষ্টিনন্দনভাবে বিচারকদের সামনে তাদের নিজস্ব কৌশল উপস্থাপন করে।​ব্যবসায়িক বাস্তবতা, সম্ভাব্যতা, সৃজনশীলতা, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ, উপস্থাপনার দক্ষতা এবং প্রস্তাবিত সমাধানের বাস্তবায়নযোগ্যতাসহ বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে বিচারকগণ কঠোরভাবে প্রতিটি দলের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করেন।​প্রতিযোগিতায় সকল দলকেই পেছনে ফেলে প্রথম স্থান ও চ্যাম্পিয়নের খেতাব ছিনিয়ে নেয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বেবি শার্কস’। তাদের উদ্ভাবনী কৌশল ও সুসংগঠিত উপস্থাপনা বিচারকদের গভীরভাবে মুগ্ধ করে। বিজয়ী দল হিসেবে ‘বেবি শার্কস’ অর্জন করে ৫০ হাজার টাকার চেক ও ট্রফি।​প্রতিযোগিতায় অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর রেখে প্রথম রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘টিম ফাঁকিবাজ’। তারা লাভ করে ৩০ হাজার টাকার প্রাইজমানি। অন্যদিকে, চমৎকার ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও যুক্তিভিত্তিক উপস্থাপনা দিয়ে দ্বিতীয় রানার্সআপ স্থান নিশ্চিত করে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) দল ‘টিম উন্নয়ন’। তারা পায় ২০ হাজার টাকার প্রাইজমানি। প্রতিযোগিতায় সর্বমোট এক লাখ টাকার পুরষ্কার প্রদান করা হয়।​​গ্র্যান্ড ফাইনাল পর্বের পুরস্কার বিতরণী ও সমাপনী অনুষ্ঠানে দেশের স্বনামধন্য শিক্ষাবিদ, কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব এবং পেশাদার ব্যক্তিবর্গের সমাগম ঘটে।অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের মান্যবর উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হাবিবুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে মঞ্চ আলোকিত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. জি. এম. শফিউর রহমান এবং কোষাধ্যক্ষ ড. মো. আব্দুস সালাম আকন্দ। এছাড়া সম্মানিত অতিথি হিসেবে তরুণদের উৎসাহ দিতে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মাহফুজুর রহমান এবং এক্সিলেন্স বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও দূরদর্শী সংগঠক বেনজীর আবরার।​চূড়ান্ত পর্বের কঠিন বিচারকার্যের দায়িত্ব পালন করেন করপোরেট ও হিসাববিজ্ঞান জগতের তিন অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব— চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস প্রতিষ্ঠান হাওলাদার ইউনুস অ্যান্ড কোং-এর প্রতিনিধি মোঃ শাখাওয়াত হোসাইন (এ.সি.এ., সি.আই.এস.এ. যোগ্যতাপ্রাপ্ত), মিডিয়া মিক্স কমিউনিকেশনস এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল্লাহ হাসান এবং কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয় এর হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান আসমা আক্তার সুমি।​প্রধান অতিথির বক্তব্যে কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, “বর্তমান বিশ্ব কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ তাত্ত্বিক জ্ঞানে চলে না। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে বাস্তব জীবনের জটিল চ্যালেঞ্জগুলোর সংযোগ ঘটাতে এ ধরনের প্রতিযোগিতা অপরিহার্য। অ্যাকাউন্টিং উইজার্ড ক্লাব যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা আমাদের শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের দক্ষ নাগরিকে পরিণত করতে বড় ভূমিকা রাখবে।”​বিশেষ অতিথি ও সম্মানিত অতিথিরা তাদের বক্তব্যে তরুণদের ব্যবসায়িক নীতি, সততা এবং সুদূরপ্রসারী চিন্তার ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানান। বিচারকমণ্ডলী প্রতিযোগীদের সমাধানের বৈচিত্র্য ও কৌশলগত দিকগুলোর ভূয়সী প্রশংসা করে ভবিষ্যতে আরও কীভাবে নিজেদের আন্তর্জাতিক মানের হিসেবে গড়ে তোলা যায়, সে বিষয়ে মূল্যবান পরামর্শ দেন।​‘বিজকেস, কেআইইউ ২০২৬’-কে একটি সর্বাঙ্গীন সফল ও জাতীয় মানের আয়োজনে রূপ দিতে পাশে ছিল দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। প্রতিযোগিতাটির কৌশলগত সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে এক্সিলেন্স বাংলাদেশ।​বিভিন্ন কর্পোরেট ও শিক্ষামূলক সংগঠনের অর্থবহ অংশীদারিত্বের কারণে পুরো আয়োজনটি একটি অনন্য মাত্রায় পৌঁছে যায়।​বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা প্রতিযোগী, দূরদর্শী বিচারকমণ্ডলী ও স্বেচ্ছাসেবকদের মিলনমেলায় জেলা শিল্পকলা একাডেমি পরিণত হয়েছিল এক উৎসবের নগরীতে। দিনভর টানটান উত্তেজনার পর সন্ধ্যায় জমকালো পুরষ্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে মেধা ও মননের এই মহোৎসবের সমাপ্তি ঘটে।​আয়োজক সংগঠন 'অ্যাকাউন্টিং উইজার্ড ক্লাব'-এর প্রতিনিধিরা জানান, প্রথম আসরের অভূতপূর্ব সাড়া তাদের নতুন উদ্দীপনা জুগিয়েছে। ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে দক্ষতা উন্নয়নমূলক ও জ্ঞানভিত্তিক আয়োজনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তারা। তরুণ প্রজন্মকে কেবল চাকরির পেছনে না ছুটিয়ে উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক ও নীতি-নির্ধারক হিসেবে গড়ে তোলাই এই ক্লাবটির মূল উদ্দেশ্য। কিশোরগঞ্জের মাটিতে রূপায়িত এই উদ্যোগ যে দেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে অবদান রাখবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সকলের।

তারুণ্যের মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তিতে মাতলো কিশোরগঞ্জ, বিজকেস কেআইইউ ২০২৬ -এর চ্যাম্পিয়ন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বেবি শার্কস।