ঢাকা    মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ কি সংকট, সংস্কার ও সম্ভাবনার সমীকরণ মেলাতে পারবে?

একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের মাঝামাঝি এসে বাংলাদেশ তার ইতিহাসের অন্যতম একটি সংবেদনশীল ও রূপান্তরকালীন পর্যায় অতিক্রম করছে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও সাধারণ নির্বাচনের পর রাষ্ট্রকাঠামো ও সামাজিক ব্যবস্থাপনায় নতুন এক দিগন্তের সূচনা হয়েছে। দীর্ঘদিনের শাসনতান্ত্রিক জড়তা কাটিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আমূল সংস্কার এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতের এক বিপুল সম্ভাবনা যেমন তৈরি হয়েছে, ঠিক তেমনি তার সমান্তরালে দেশ এক গভীর সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। এই দুই বিপরীতমুখী বাস্তবতার মধ্য দিয়েই বর্তমানে এগোচ্ছে বাংলাদেশ।​বিগত নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক ধরনের গুণগত পরিবর্তনের হাওয়া লক্ষ করা যাচ্ছে। বর্তমান প্রশাসন ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা আমূল বদলে ফেলার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এখন কেবল ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নয়, বরং রাষ্ট্র সংস্কারের নীতিগত জায়গাগুলোতে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করছে। এমনকি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে বিকল্প জাতীয় বাজেট এবং নীতি-প্রস্তাবনা পেশ করার মতো ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চাও শুরু হয়েছে।​এই অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের সাথে মিল রেখে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির তীব্র টানাপড়েনের মধ্যে বাংলাদেশ বর্তমানে একটি স্বাধীন ও 'নির্জোট' অর্থনৈতিক কূটনীতি অনুসরণ করছে। তৈরি পোশাক রপ্তানির জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন, উন্নয়ন অর্থায়ন ও আমদানির জন্য চীন ও ভারত, এবং রেমিট্যান্স সুরক্ষায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে সমদূরত্ব ও পারষ্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পর্ক বজায় রাখাই এখন রাষ্ট্রের প্রধান পররাষ্ট্র কৌশল হিসেবে দেখা যাচ্ছে।​তবে রাজনৈতিক ফ্রন্টের এই স্বস্তির বিপরীতে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি একটি 'অস্বস্তিকর স্থিতিশীলতা' বা uneasy calm-এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাহ্যিক খাতের কিছু সূচকে উন্নতি হলেও অভ্যন্তরীণ আর্থিক খাত এখনো বেশ ভঙ্গুর। বিশেষ করে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি বর্তমানে ৮.৫% থেকে ৯.২%-এর ঘরে ওঠানামা করায় নিম্ন ও মধ্যবিত্তের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী হয়েছে। সুদের হার বাড়িয়েও বাজার সিন্ডিকেটের কারণে মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না।​অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ক্ষতটি দৃশ্যমান হচ্ছে ব্যাংকিং খাতে, যেখানে খেলাপি ঋণের (NPL) পরিমাণ মোট বিতরণের ৩৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এই তারল্য ঘাটতি মেটাতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সামলাতে সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) বিদ্যমান ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণের পাশাপাশি একটি নতুন ফলো-আপ বা 'সাকসেসর অ্যারেঞ্জমেন্ট' (Successor Arrangement)-এর জন্য আলোচনা শুরু করেছে।​এরই মধ্যে আগামী নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উন্নয়নশীল দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরণের কথা রয়েছে। এই উত্তরণ দেশের জন্য যেমন একটি বড় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, তেমনি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসছে। উত্তরণের পর বাংলাদেশ উন্নত দেশগুলোতে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাণিজ্য সুবিধা হারাবে, যা রপ্তানি আয়ের মূল উৎস তৈরি পোশাক (RMG) খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে কর-জিডিপি অনুপাত ৭%-এর নিচে থাকায় রাষ্ট্রীয় অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণের সক্ষমতাও সীমিত। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন দেশের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া বেগবান করার চেষ্টা করছে।​সামাজিক ক্ষেত্রে 'যুব বেকারত্ব' বর্তমানে একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও সেই অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ না আসায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত রয়ে গেছে। পাশাপাশি, জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাবও এই বছর তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। চলতি জুন মাসের তীব্র তাপপ্রবাহ এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত দেশের কৃষি উৎপাদনকে ব্যাহত করছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক ধরনের নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে।​অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি ঐতিহাসিকভাবেই দৃঢ়, যার মূল চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স এবং কৃষি। তবে বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য ব্যাংকিং খাতের কঠোর আইনি সংস্কার, করের আওতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত প্রশাসনিক সহজীকরণ অপরিহার্য।​সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটকে 'চ্যালেঞ্জের মুখে রূপান্তরের নতুন অধ্যায়' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা চলে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যে গুণগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেখা যাচ্ছে, তার সফল বাস্তবায়ন এখন পুরোপুরি নির্ভর করবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ওপর। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বাজার তদারকি ও সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং যুবশক্তিকে আধুনিক কারিগরি দক্ষতায় রূপান্তর করার মাধ্যমেই কেবল বাংলাদেশ বর্তমান সংকট কাটিয়ে একটি টেকসই প্রবৃদ্ধির মহাসড়কে ফিরতে পারবে।​লেখক: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।//আরইউএস

বাংলাদেশ কি সংকট, সংস্কার ও সম্ভাবনার সমীকরণ মেলাতে পারবে?