বিতর্কের বৃত্তে বেরোবি, প্রশাসনিক সংকটের নেপথ্যে কী?
চলতি বছরের অক্টোবরে দেড় যুগে পা রাখতে যাচ্ছে ‘উত্তরের বাতিঘর’ বলে খ্যাত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি)। ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকেই উত্তরাঞ্চলীয় বিভাগীয় শহর রংপুরের একমাত্র এই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়টি বহুবিধ সংকট ও চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে।তবে বিশ্ববিদ্যালয়টির অংশীজনদের দীর্ঘদিনের আফসোসের বিষয় হলো ৭৫ একরের এই শিক্ষাঙ্গণকে জাতীয় পর্যায়ে যতটা না ইতিবাচকভাবে তুলে ধরা হয়, তার চেয়ে ঢের বেশি উপস্থাপন করা হয় নেতিবাচকভাবে। বিশেষত, ছয়জন উপাচার্যের আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা নিয়োগ-পদোন্নতিতে জালিয়াতি, দুর্নীতি ও অনিয়মের বহু ইস্যু এ ক্ষেত্রে নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে থাকে। এর সঙ্গে ‘মড়ার ওপর খাড়ার ঘা’ হিসেবে ছয় উপাচার্যের মধ্য হতে তিনজনেরই কারান্তরীণ হওয়ার লজ্জাকর দৃষ্টান্ত তো আছেই। এতে প্রায়শই বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অনেকে পড়েন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে।
বেরোবির উপাচার্যনামাসংশ্লিষ্ট তথ্যসূত্র মোতাবেক, ২০০৮ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বেরোবির উপাচার্য হিসেবে ছয়জন ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম উপাচার্যের দায়িত্ব পান প্রফেসর ড. মো. লুৎফর রহমান। একই বছরে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে ২০০৯ সালের মাঝামাঝি তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন প্রফেসর ড. আব্দুল জলিল মিয়া।প্রথম উপাচার্য ড. মো. লুৎফর রহমানের বিরুদ্ধে তেমন কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে স্বজনপ্রীতি, লাগামহীন স্বেচ্ছাচারিতা, ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ২০১৩ সালের ৪ মে বেরোবির উপাচার্যের পদ হতে পদত্যাগে বাধ্য হন দ্বিতীয় উপাচার্য ড. জলিল। তাঁর বিরুদ্ধে নিজের কন্যা, ভাইসহ কয়েক ডজন স্বজন, আত্মীয়কে অবৈধভাবে নিয়োগ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দলীয় সুপারিশের নিরিখে গোটা প্রক্রিয়া পরিচালনার অভিযোগ তোলেন সে সময়ে আন্দোলনকারীরা।দায়িত্ব ছেড়ে কানাডায় চলে গেলেও, ২০১৭ সালের ২০ জুলাই দেশে ফেরার পর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় বাংলাদেশের প্রথম কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে জেলে যান জলিল। তবে পরে জামিন পান তিনি। সংশ্লিষ্টদের মতে, ড. জলিল প্রশাসনের সময় থেকেই বেরোবিতে নিয়োগ, পদোন্নতি ও চাকরি স্থায়ীকরণকে কেন্দ্র করে ক্ষমতার বলয় সৃষ্টি দৃশ্যমানভাবে শক্তিশালী হতে শুরু করে।এ দিকে, ২০১৩ সালের ৮ মে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন প্রফেসর ড. একেএম নুরুন্নবী। মেয়াদের চার বছর পূর্ণ হওয়ার তিন দিন আগে দায়িত্ব ছাড়েন তিনি। নুরুন্নবীর বিরুদ্ধেও একাধিক আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা দায়ের করে দুদক। তবে জলিল মিয়ার মতো কারান্তরীণ হতে হয়নি তাঁকে।এর ধারাবাহিকতায়, ২০১৭ সালের মাঝামাঝি বেরোবির চতুর্থ উপাচার্য হয়ে রংপুরে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ। ২০২১ সালের জুনে তিনি দায়িত্ব ছাড়েন।কলিমউল্লাহর বিরুদ্ধেও আর্থিক অনিয়ম, অস্বচ্ছ নিয়োগ, চাকরি স্থায়ীকরণ ও পদোন্নতি কার্যক্রম পরিচালনা, স্বেচ্ছাচারিতা, দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয় অফিসে অনুপস্থিত থাকার মতো নানা অসঙ্গতি ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ ওঠে সে সময়ে। তাঁর বিরুদ্ধে ৭৯০ পৃষ্ঠার শ্বেতপত্রও প্রকাশ করেন আন্দোলনরত শিক্ষক-কর্মকর্তারা। পরে গত বছরের আগস্টে বেরোবির বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে দায়েরকৃত দুদকের মামলায় বিশ্ববিদ্যালয়টির দ্বিতীয় উপাচার্য হিসেবে জেলে যান তিনি। এখনও কারাবন্দী আছেন তিনি।কলিমউল্লাহর পর বেরোবির প্রধান প্রশাসনিক পদে আসীন হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. মো. হাসিবুর রশীদ। তিনি কলিমউল্লাহ আমলে বেরোবির কোষাধ্যক্ষের দায়িত্বে ছিলেন। পূর্বসূরীদের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের কাছের শিক্ষক, কর্মকর্তাদের অবৈধ পদোন্নতি দেওয়ার মতো বেশকিছু অনিয়মের অভিযোগ ওঠে বেরোবির পঞ্চম উপাচার্যের বিরুদ্ধে।পাশাপাশি, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের হামলায় মদদ দেওয়ার। তৎপরবর্তী সময়ে ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পদত্যাগ করে আত্মগোপনে চলে যান তিনি।পরে শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার প্রধান আসামি হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন হাসিবুর রশীদ। গত ১৬ মে রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে বেরোবির তৃতীয় উপাচার্য হিসেবে তাঁকেও গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।অপর দিকে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বেরোবির ষষ্ঠ উপাচার্য হিসেবে বর্তমানে দায়িত্বে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. মো. শওকাত আলীর নামের সঙ্গেও বিতর্ক জড়িয়ে আছে। ২০২৩ সালের ১৫ জুন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নিয়োগ পরীক্ষায় জাল খাতা প্রণয়ন, টেম্পারিং ও জালিয়াতির অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয় শওকাত আলীর বিরুদ্ধে। পরে ইস্যুটি নিয়ে “নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল করে নতুন করে আয়োজন করা হয়েছিল” বলে বেশকিছু গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেন ড. শওকাত আলী।পাশাপাশি, সম্প্রতি প্রকাশিত একাধিক গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ড. শওকাত আলীর বিরুদ্ধে বেরোবিতেও নতুন করে আর্থিক অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে সরকারি বাংলোয় অবস্থান করেও ছয় মাসে প্রায় ১ লাখ ৯৬ হাজার টাকা বাড়িভাড়া উত্তোলন করা, স্ত্রীর জন্য কেনা ২ হাজার ৭৩৯ টাকার শাড়ির মূল্য বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে পরিশোধ, গবেষণা প্রকল্প থেকে বিধিবহির্ভূতভাবে ৫ লাখ টাকা গ্রহণ, বিভিন্ন সেমিনারের সম্মানী হিসেবে আরও ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা উত্তোলনের অভিযোগও সামনে আসে।একই সঙ্গে উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত দুটি গাড়ির জন্য মাত্র নয় মাসে ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকার জ্বালানি ব্যয় দেখানো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, যা নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। তবে এসব বিষয় সঠিক নয় বলে অভিযোগগুলোকে অস্বীকার করেছেন ড. শওকাত।
যা বলছেন অংশীজনরাবিশ্ববিদ্যালয়টির সকল ঘরানার অংশীজনদের মতে, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক অদক্ষতা, দুর্বল জবাবদিহিমূলক কাঠামো এবং শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়োগ-পদোন্নতি আর চাকরি স্থায়ীকরণকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা স্বার্থসংশ্লিষ্ট বলয় বেরোবির এই প্রশাসনিক সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে। পাশাপাশি, উপাচার্য নিয়োগে একাডেমিক নেতৃত্ব, প্রশাসনিক দক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পাওয়ায় বারবার বিতর্কিত ব্যক্তিদের হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব চলে যাচ্ছে বলেও মনে করেন তারা।একই সঙ্গে তুলনামূলক নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার কারণে বেরোবিতে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি, কার্যকর অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ব্যবস্থা ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি বলে মত সংশ্লিষ্টদের।আবার, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে উপাচার্যকেন্দ্রিক ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণের সুযোগ তৈরি হওয়ায় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ, নিয়োগ বোর্ড, পদোন্নতি কমিটি ও ক্রয়সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে উপাচার্যদের একক প্রভাব অক্ষুণ্ণ রাখতে তাঁদের ঘিরে প্রত্যেকটি আমলেই গড়ে উঠেছে অনুগত শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বলয়। পরবর্তীতে এই বলয়ই নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সুবিধা লাভের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেরোবিতে প্রায় প্রতিটি প্রশাসনের সময়ই নিয়োগ, পদোন্নতি কিংবা চাকরি স্থায়ীকরণকে কেন্দ্র করে বিভক্তি, পক্ষপাত ও স্বজনপ্রীতির মতো নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। শিক্ষাঙ্গণটিতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ শিক্ষক ও কর্মকর্তারা প্রশাসনিক সুবিধা পেয়ে আসছেন এমন অভিযোগও বহুদিনের।তাদের ভাষায়, বিশ্ববিদ্যালয়টির ভেতরে একটি স্থায়ী ‘পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক প্রশাসনিক সংস্কৃতি’ তৈরি হওয়ায় ব্যক্তি আনুগত্য অনেক ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালার চেয়ে বেশি কার্যকর হয়ে উঠেছে। এ কারণেই উপাচার্য বদলালেও বেরোবিতে অভিযোগের ধরন খুব একটা বদলায় না। আর্থিক অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার অভিযোগের ধারাবাহিকতাও থাকে অব্যাহত।সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিভিন্ন সময়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, তদন্ত কমিটি গঠন কিংবা দুদকের মামলা ও অভিযান পরিচালনা হলেও সেসব উদ্যোগ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্রেফ নির্দিষ্ট পদসমূহ হতে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের অপসারণ বা সাময়িক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় প্রশাসনিক নিয়োগ ও পদোন্নতির প্রক্রিয়া, আর্থিক তদারকি ব্যবস্থা, সিন্ডিকেটের কার্যকর জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ কাঠামোয় দৃশ্যমান সংস্কার সাধিত হয়নি। এতে করে এক প্রশাসনের বিতর্ক শেষ হতে না হতেই আরেক প্রশাসনকে ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হচ্ছে। একই ধরনের দৃশ্যপটের অবতারণা ঘটছে বারবার।
শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়াবেরোবির উপাচার্যবৃন্দ এবং প্রশাসনিক নানা কর্মকাণ্ডের বিতর্ক নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায় সর্বদা।বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রবিউল ইসলাম বলেন, প্রতিষ্ঠার মাত্র ১৮ বছরের মধ্যেই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয়বার উপাচার্য পরিবর্তন হয়েছে। দায়িত্ব পালন শেষে অধিকাংশ উপাচার্যের বিরুদ্ধেই দুর্নীতি, অনিয়ম ও নৈতিক অবক্ষয়ের অভিযোগ উঠেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন উপাচার্যের আগমনে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হলেও, দেড় বছরের ব্যবধানে তাঁর বিরুদ্ধেও নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে।তিনি বলেন, এখানে দায়িত্ব নিতে আসা প্রায় প্রত্যেক উপাচার্যই নিজ নিজ কর্মজীবনে দক্ষ ও স্বপ্নবান ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পর অনেকেই নানা অনিয়ম, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। এর পেছনে শিক্ষক রাজনীতি, ছাত্র রাজনীতি এবং দীর্ঘদিনের অকার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন রবিউল।তাঁর ভাষায়, এতে বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে বারবার পিছিয়ে পড়ছে। ধারাবাহিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবেই মূলত প্রতিষ্ঠার এত বছর পরও বিশ্ববিদ্যালয়টি পূর্ণাঙ্গ বিকাশ লাভ করতে পারেনি। এ কারণে শিক্ষার্থীরাও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিক্ষা, গবেষণা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়ছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।এ ছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থী মো. সবুর হোসেন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) উত্তরাঞ্চলের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগে প্রশাসনিক দক্ষতার বদলে রাজনৈতিক বিবেচনার দিকে সবসময় প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তাই এখানে ইচ্ছামতো ভিসিরা আসেন এবং তাদের ইচ্ছামতো এখানে রাজনৈতিক রাজত্ব গড়ে তোলেন। রাজনৈতিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে তারা অনেক সময় ত্রাসের রাজত্বও গড়ে তোলেন এবং সেখানে প্রত্যেকটা কাজের যে অর্থ দেওয়া হয়, সেই কাজের অর্থ তারা আত্মসাৎ করেন সদলবলে। যা আমাদের ইউনিভার্সিটিকে আরও ২০ বছর পিছিয়ে দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমরা দেখেছি যে ভিসি চেঞ্জ হয়েছে, ভিসি চেঞ্জ হচ্ছে। কিন্তু সবাই কোনো না কোনোভাবে এ রকম বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত। হাসিবুর রশীদ আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে জেলে গেছেন সম্প্রতি। কলিমুল্লাহ স্যার আর জলিল স্যারও বেরোবিতে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে কারান্তরীণ হয়েছেন। এই ঘটনাগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করছে বলে দাবি তাঁর। সবুরের মতে, একজন উপাচার্য এককভাবে আসলে সকল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নও করতে পারেন না। নিয়োগসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সিন্ডিকেট ও বিভিন্ন প্রশাসনিক কমিটির অনুমোদনের মাধ্যমেই কার্যকর হওয়ার নিয়ম থাকায় প্রভাবশালী শিক্ষক রাজনীতিই মূলত প্রশাসনিক কাঠামো ও তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতার দিককে স্পষ্ট করে তুলছে বেরোবিতে।চাকরি স্থায়ীকরণ বা পদোন্নতিই কি প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার?রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং শহীদ ফেলানী হলের সাবেক সহকারী প্রভোস্ট ফারজানা জান্নাত তোশি বেরোবির প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতার নানা দিক চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন।তিনি বলেন, বেরোবির বিগত ১৭ বছরের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এখানে সম্ভবত তিন বছর শুধু পূর্ণাঙ্গ প্রশাসন ছিল। যেটা হচ্ছে ভিসি, প্রো-ভিসি, ট্রেজারার এবং রেজিস্ট্রার। (এর বাইরে) অধিকাংশ সময়ই ভিসিরা এখানে এককেন্দ্রিক হয়ে গেছেন। যার কারণে ক্ষমতাও আসলে এককেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে আইনগুলো আছে, সেগুলোও ভিসির সুপ্রিম পাওয়ারে চলে গেছে।একদলীয় ভিসিদের কথাই সর্বাত্মক হয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে প্রশাসনিক কাঠামোর সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন তোশি।তিনি আরও বলেন, আমরা কোনোভাবেই দলীয়করণ থেকে বের হতে পারছি না। এতে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ক্ষমতার সুষম বণ্টন নিশ্চিত হচ্ছে না। ফলে আমরা দক্ষ মানুষগুলোকে খুঁজে পাচ্ছি না। গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে অভিজ্ঞতার চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাবকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় দক্ষ নেতৃত্বও তৈরি হচ্ছে না।উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ছাড়াই শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে দীর্ঘ সময় প্রো-ভিসি ও ট্রেজারার পদে পূর্ণাঙ্গ নিয়োগ না থাকাও প্রশাসনিক দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়েছে।এই শিক্ষকের দাবি, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের স্থায়ীকরণ ও পদোন্নতিকেও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে শুরু থেকেই। এখনও বহু শিক্ষক অস্থায়ী পদে রয়েছেন এবং পদোন্নতি-সংক্রান্ত জটিলতায় ভুগছেন। ফলে অনেকে ক্ষমতাসীন বলয়ের সঙ্গে সমঝোতা করে চলতে বাধ্য হওয়ায় প্রশাসনিক ক্ষমতা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পুরো ব্যবস্থাকে দুর্নীতিগ্রস্ত করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সময়কার আন্দোলনও অনেক সময় ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তার ভাষ্য, (অসৎ) শিক্ষক রাজনীতির প্রভাব ও ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনগুলোর লক্ষ্য ও চেতনা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শিক্ষাঙ্গণটির কাঠামোগত সংস্কার সাধন মুখ থুবড়ে পড়েছে।
উত্তরণ কোন দিকে?সামগ্রিক বিষয়ে বেরোবির সিন্ডিকেটে সরকার কর্তৃক মনোনীত অন্যূন যুগ্ম-সচিব পদমর্যাদায় প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের প্রফেসর ড. মো. হুমায়ুন কবীর চৌধুরী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের ঘিরে বিতর্কের পেছনে শুধু ব্যক্তি নয়, প্রশাসনিক কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ারও দায় রয়েছে।তিনি বলেন, কোনো উপাচার্য এককভাবে সব সিদ্ধান্ত নেন না। নিয়োগ বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বিভিন্ন কমিটি ও সিন্ডিকেটের অনুমোদনের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। তার ভাষ্য, “একজন ভাইস চ্যান্সেলর ইচ্ছা করলেই সবকিছু করতে পারে না। বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমেই তাকে কাজ করতে হয়।”হুমায়ুন কবীর উল্লেখ করেন, সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. আব্দুল জলিল মিয়ার বিরুদ্ধে নিয়োগ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও, এ ধরনের ঘটনা দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়েও ঘটেছে। তিনি বলেন, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় স্থানীয় প্রভাব ও নিয়োগকেন্দ্রিক চাপ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশি কাজ করতে পারে।তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রশাসনিক কমিটিগুলোর কার্যকর ভূমিকা থাকলে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ঠেকানো সম্ভব। তাঁর মতে, সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল ও অর্থ কমিটির সদস্যরা যদি উপাচার্যের প্রতিটি সিদ্ধান্তে শুধু সম্মতি দেন, তাহলে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। “কোনো সিন্ডিকেট যদি দেখতে চায় নিয়োগ বা সিদ্ধান্ত নিয়মের মধ্যে হয়েছে কি না, তাহলে তারা সেই সিদ্ধান্ত বাতিলও করতে পারে,” বলে জানান তিনি।হুমায়ুনের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক সংস্থা হিসেবে সিন্ডিকেট কীভাবে গঠিত হচ্ছে, কারা তাতে সদস্য হচ্ছেন এবং সদস্যরা কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করছেন, সেই দিকে নজর দিলে বেরোবির বিদ্যমান প্রশাসনিক দুর্বলতা অনেকাংশে কাটানো সম্ভব।