ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

মিছিলের রাজপথ থেকে নেতৃত্বের মঞ্চে মির্জা ফয়সল আমীন

মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী জীবন, মায়ের কয়লা ভেঙে রান্নার জ্বালানি জোগাড়, রাজনৈতিক মামলা, বিদেশজীবন ও রাজপথের আন্দোলন—জীবনের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন মির্জা ফয়সল আমীন।১৯৬৩ সালে ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায় মির্জা রুহুল আমিন (চখামিয়া) ও ফাতেমা বেগমের ঘরে তাঁর জন্ম। সাত ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট ফয়সল আমীনের বাবা ছিলেন শিক্ষক, রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী। তিনি প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য, ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান ও ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। পরে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।মুক্তিযুদ্ধের আগে নিরাপত্তার কারণে পরিবারটি ঠাকুরগাঁওয়ের ভুল্লীর বালিয়া, পঞ্চগড়ের মির্জাপুর ও রানীশংকৈলের বনগাঁয়ে আশ্রয় নেয়। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হলে ছোট সন্তানদের নিরাপত্তার জন্য পরিবার নিয়ে ভারতে চলে যান তাঁর বাবা। ইসলামপুরে শরণার্থী হিসেবে ছোট একটি ঘরে কাটে তাঁদের দিন। খাবার ও জ্বালানির সংকট ছিল নিত্যসঙ্গী। মা ফাতেমা বেগমকে রান্নার জন্য কয়লা ভাঙতে হতো। পরিবারের বড় ছেলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তখন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে পরিবারটি দেখে, বাড়িঘর ও সম্পদের অনেক কিছুই লুট হয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের আগে আন্দোলনরত যোদ্ধাদের যাতায়াতে পরিবারের পেট্রোল পাম্প থেকে বিনা মূল্যে জ্বালানি দেওয়া হয়েছিল বলেও পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়।ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করে ঢাকা কলেজ এবং পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন ফয়সল আমীন। ছাত্রজীবনেই ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হন। জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থী হলেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়মিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যাতায়াত করতেন। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও রাজপথে সক্রিয় ছিলেন।পড়াশোনা শেষে বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন এবং চাকরির পাশাপাশি মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। পরে চাকরি ছেড়ে ঠাকুরগাঁওয়ে ফিরে যুবদলের রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৯৬ সালে বিএনপি নির্বাচনে পরাজিত হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর তাঁর বিরুদ্ধে ১৬টি মামলা হয়। মামলাগুলোতে তাঁকে এক নম্বর এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দুই নম্বর আসামি করা হয়েছিল বলে তিনি জানান।পরে কয়েক বছর বিদেশে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। সেখানেও প্রবাসী যুবদলের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। দেশে ফিরে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সহসভাপতি এবং পরে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় বিএনপির মনোনয়নে ধানের শীষ প্রতীকে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন।মেয়র থাকাকালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও তাঁর কার্যালয়ের টেবিলে খালেদা জিয়ার ছবি রেখে দায়িত্ব পালন করেন বলে জানা যায়। একই সময়ে বিএনপির আন্দোলন ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ছিলেন তিনি।রাজনীতির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও রয়েছে তাঁর সম্পৃক্ততা। তাঁর উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতায় ঠাকুরগাঁওয়ের নিশ্চিন্তপুর থিয়েটার গড়ে ওঠে। নাট্যকর্মী লিটু আনামও তাঁর হাত ধরে নাট্যজীবনে যুক্ত হন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।নিজের রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে ফয়সল আমীন বলেন, ‘রাজনীতির সঙ্গে আমার পরিচয় ছোটবেলা থেকেই। বাবার সঙ্গে নির্বাচনী মাঠে ঘুরেছি, মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চেয়েছি। পরে ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হই। জীবনের নানা সময়ে মামলা, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও প্রবাসজীবন এসেছে। কিন্তু কোনো পরিস্থিতিই আমাকে মানুষের কাছ থেকে দূরে রাখতে পারেনি।’তিনি আরও বলেন, ‘ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের সঙ্গে আমার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। মানুষের পাশে থাকার যে শিক্ষা বাবা ও বড়ভাইয়ের কাছ থেকে পেয়েছি, সেটিই আমার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা।’

মিছিলের রাজপথ থেকে নেতৃত্বের মঞ্চে মির্জা ফয়সল আমীন