ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

নওগাঁয় মেরিনা বেগম হত্যা: ১২ ঘণ্টার মধ্যে দুই আসামি গ্রেপ্তার

নওগাঁর ধামইরহাটে মেরিনা বেগম (৪৫) নামে এক নারীকে নৃশংসভাবে হত্যার পর মরদেহে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় মামলা হওয়ার ১২ ঘণ্টার মধ্যে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ সময় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি বেল্ট ও ভিকটিমের জুতার ব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে।গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—ধামইরহাট উপজেলার মড়লই গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য মো. বাবুল হোসেন (৪৯) এবং একই গ্রামের মো. তারেক রহমান (২১)।পুলিশ জানায়, গত ১৮ আগস্ট সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে ধামইরহাট থানাধীন ২ নম্বর আগ্রাদ্বিগুন ইউনিয়নের তালপুকুর-মাহমুদপুর (ভালকাডাঙ্গা) এলাকায় একটি আমবাগানের গভীর জঙ্গলে আগুনে পোড়া এক নারীর মরদেহ পড়ে থাকার খবর পায় পুলিশ। খবর পেয়ে নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম ধামইরহাট থানার অফিসার ইনচার্জ ও পত্নীতলা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে দ্রুত ঘটনাস্থলে যাওয়ার নির্দেশ দেন এবং নিজে বিষয়টি তদারকি শুরু করেন।প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যেও প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরের ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ আগুনে পোড়া এক মধ্যবয়সী নারীর মরদেহ দেখতে পায়। মরদেহের পাশে তার ব্যবহৃত কিছু প্রসাধনী সামগ্রী ও পরিচয়সংক্রান্ত কাগজপত্র পড়ে ছিল।এদিকে একই সময়ে কাউসার আলী নামে এক ব্যক্তি তার মায়ের নিখোঁজের বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি করতে ধামইরহাট থানায় আসেন। পরে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহটি তার মা মেরিনা বেগমের বলে শনাক্ত করেন। পুলিশ জানায়, মেরিনা বেগম তিন-চার দিন আগে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ ছিলেন। ঘটনাটি ক্লুলেস হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে সিআইডি ও পিবিআইকে অবহিত করা হয়।এরপর তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা, স্থানীয় তদন্ত ও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে পুলিশ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তে কাজ শুরু করে। মধ্যরাতের পর পত্নীতলা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শরীফ ও ধামইরহাট থানার অফিসার ইনচার্জ মিন্টুর নেতৃত্বে অভিযান শুরু হয়। প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যেও টানা ছয় থেকে সাত ঘণ্টার অভিযানে প্রথমে সাবেক ইউপি সদস্য মো. বাবুল হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরে মো. তারেক রহমানকেও গ্রেপ্তার করা হয়।পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার দুই আসামি হত্যাকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে। তাদের দেওয়া তথ্য ও দেখানো স্থান থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি বেল্ট এবং হত্যার পর ফেলে দেওয়া ভিকটিমের জুতার ব্যাগ উদ্ধার করা হয়।পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, মেরিনা বেগমের সঙ্গে গ্রেপ্তার আসামি বাবুল হোসেনের পূর্বপরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক ছিল। মোবাইল ফোনে তাদের নিয়মিত যোগাযোগ হতো। একপর্যায়ে মেরিনা তাকে বিয়ের জন্য চাপ দেন। বিয়ে না করলে তার বাড়িতে যাওয়ার অথবা আত্মহত্যার হুমকি দেন বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। এরপর বাবুল হোসেন তাকে ১৬ আগস্ট বিয়ে করার কথা জানান।পুলিশ জানায়, ওই দিন মেরিনা বাড়ি থেকে বের হলে বাবুল হোসেন অপর আসামি তারেক রহমানসহ আরও দুইজনকে তাকে নিয়ে আসার জন্য পাঠান। তারা সাহাপুর বাজার থেকে মেরিনাকে আগ্রাদ্বিগুন বাজারে নিয়ে আসে। সেখানে বাবুল হোসেন মোটরসাইকেলে এসে একটি তেলের দোকান থেকে তিন লিটার পেট্রোল কেনেন। এর মধ্যে দুই লিটার মোটরসাইকেলে এবং এক লিটার বোতলে করে একটি বাজারের ব্যাগে রাখা হয়।পরে আসামিরা মেরিনাকে নিয়ে ঘটনাস্থলের কাছে মনিহারী-তালপুকুর সড়কের পাশে যায়। সেখান থেকে তাকে প্রায় ৩০০ ফুট দূরে আমবাগানের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে তারেক রহমানের কোমর থেকে বেল্ট খুলে মেরিনা বেগমের গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করা হয়। পরে মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর আলামত নষ্ট ও পরিচয় গোপন করার উদ্দেশ্যে তার শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে মরদেহের ঊর্ধ্বাংশ পুড়ে যায়।পুলিশ আরও জানায়, ঘটনার পর ভিকটিমের দুটি ব্যাগের একটি নিয়ে বাবুল হোসেন সড়কে চলে যান এবং জুতার ব্যাগটি আমবাগানের ভেতরে ছুড়ে ফেলেন। পরে আসামিরা একত্রে বাবুল হোসেনের বাড়িতে গিয়ে মেরিনার কাছ থেকে নেওয়া টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। অন্য তিনজন আড়াই হাজার টাকা করে পেয়েছে বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে।পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে আরও জানা যায়, মেরিনা বেগমের ছেলে মো. কাউসার আলী এবং তার স্বামী মো. হাছেন আলী (৫৫) জীবিকার প্রয়োজনে কুমিল্লায় অবস্থান করছিলেন। গত ১৪ আগস্ট বেলা আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে মেরিনা গরুর জন্য ঘাস কাটতে বাড়ি থেকে বের হন। এরপর তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। খবর পেয়ে ছেলে কাউসার আলী কুমিল্লা থেকে নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন।পুলিশ জানায়, এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মোট চারজন জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তার দুই আসামির পাশাপাশি আরও দুইজনকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, “নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড এবং আগুনে পোড়ানো মরদেহের ঘটনায় ক্লুলেস মামলার রহস্য পুলিশ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উদঘাটন করেছে এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে। নওগাঁ জেলা পুলিশ জেলায় যেকোনো ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। একই সঙ্গে অপরাধ প্রতিরোধে জেলা পুলিশ সর্বাত্মকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।”

নওগাঁয় মেরিনা বেগম হত্যা: ১২ ঘণ্টার মধ্যে দুই আসামি গ্রেপ্তার