ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

ফের হামের ছায়ায় বাংলাদেশের শিশুরা

বাংলাদেশে একসময় প্রায় নিয়ন্ত্রণে চলে আসা হাম (Measles) আবারও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশের বিভিন্ন জেলায় নতুন করে সংক্রমণ বাড়তে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের হার বৃদ্ধি এবং কিছু এলাকায় মৃত্যুর ঘটনা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নতুন করে সতর্ক করেছে।হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রাথমিক পর্যায়ে জ্বর, সর্দি, কাশি ও চোখ লাল হওয়া দেখা দেয়। কয়েক দিনের মধ্যে শরীরে লালচে র‍্যাশ বা দাগ দেখা দেয়। সাধারণ মনে হলেও এই রোগ নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি এবং মস্তিষ্কের সংক্রমণের মতো মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্ট ও টিকা না পাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেক বেশি।স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরু থেকে দেশে হামের সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। একাধিক জেলায় নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ার পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহর ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীর চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে ৯ হাজার ৮৩৩ জন।এতে করে মোট সন্দেহভাজন সংক্রমণের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮১ হাজার ৮৪।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হামে নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা ৯২। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৫৩৯ জন।এ নিয়ে হাম ও হামের উপসর্গে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৬৩১জন।ঢাকার নিম্নআয়ের ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সংক্রমণ তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে বস্তি ও অস্থায়ী বসবাস এলাকাগুলোতে রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। একই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে কিছু গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলেও, যেখানে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো কঠিন।রাজধানীর একটি সরকারি শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক শিশুর মা বলেন- কয়েক দিন ধরে তার সন্তানের জ্বর ও কাশি ছিল। পরে শরীরে র‍্যাশ দেখা দিলে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয় এবং জানা যায় শিশুটি হাম আক্রান্ত। চিকিৎসার পাশাপাশি পরিবারটি মানসিক ও আর্থিক চাপের মুখে পড়ে।জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে চলমান সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) অতীতে সফল হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু এলাকায় টিকা কভারেজ কমে গেছে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের সংখ্যা বেড়েছে, যা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধে দুই ডোজ টিকা অত্যন্ত কার্যকর। কিন্তু নির্ধারিত হারে টিকা না দিলে রোগটি দ্রুত ফিরে আসতে পারে। কারণ এটি বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক ভাইরাস রোগগুলোর একটি, যা খুব সহজেই মহামারির আকার নিতে পারে।জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বেনজির আহমেদ জানান, শিশুদের সময়মতো হামের টিকা না দেওয়ার ফলে কাঙ্ক্ষিত 'হার্ড ইমিউনিটি' বা গোষ্ঠীগত প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হচ্ছে না। ৯৫% টিকাদান হার নিশ্চিত করতে না পারলে এই ছোঁয়াচে রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।সরকার ইতোমধ্যে পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। বিভিন্ন জেলায় বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ভিটামিন-এ বিতরণ, রোগ শনাক্তকরণ কার্যক্রম জোরদার এবং হাসপাতালগুলোতে আলাদা চিকিৎসা ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু জরুরি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। দীর্ঘমেয়াদে টিকাদান ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভ্রান্ত তথ্যও পরিস্থিতিকে জটিল করছে, যা টিকা গ্রহণে অনীহা তৈরি করছে।শিশু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি রোগের প্রাদুর্ভাব নয়, বরং এটি দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি সতর্ক সংকেত। টিকাদান ব্যবস্থার দুর্বলতা, স্বাস্থ্যসেবায় অসমতা এবং সচেতনতার ঘাটতি একত্রে এই সংকটকে তীব্র করেছে।বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, প্রতিটি আক্রান্ত শিশু শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। কারণ একটি সংক্রামিত শিশু অল্প সময়ের মধ্যেই আশপাশের অনেক শিশুকে আক্রান্ত করতে পারে।বাংলাদেশ একসময় সফলভাবে হাম নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়েছিল। সেই অর্জন ধরে রাখতে হলে এখন আবারও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। টিকাদান কার্যক্রমের সম্প্রসারণ, মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা এবং অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।হাম তাই কেবল একটি রোগ নয়—এটি একটি বার্তা। এটি মনে করিয়ে দেয়, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সামান্য দুর্বলতাও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই পুরোনো আতঙ্ক আরও বিস্তৃত হতে পারে।লেখক: সম্পা রায়, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।#আরইউএস

ফের হামের ছায়ায় বাংলাদেশের শিশুরা