ঢাকা    বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

স্মার্টফোন কি অকালে বুড়ো বানাচ্ছে?

আধুনিক জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে স্মার্টফোন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ, বিনোদন, যোগাযোগ—সবকিছুই এখন এই ছোট ডিভাইসের ওপর নির্ভরশীল। সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করা, রিলস বা শর্ট ভিডিও দেখা, অনলাইন নিউজ পড়া কিংবা গেম খেলা—দৈনন্দিন জীবনে ফোনের ব্যবহার এতটাই বেড়েছে যে অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যাচ্ছে তা টেরও পাওয়া যায় না। তবে সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা বলছে, এই অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শুধু চোখের ক্ষতি নয়, বরং শরীর ও মস্তিষ্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে, যা দ্রুত বার্ধক্যের প্রক্রিয়াকেও ত্বরান্বিত করতে পারে।বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণার বরাতে বিজ্ঞানীরা বলছেন, স্মার্টফোন, ল্যাপটপ ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস থেকে নির্গত নীল আলো (blue light) শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটায়। এই আলো মেলাটোনিন হরমোনের উৎপাদন কমিয়ে দেয়, যা ঘুম নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে ঘুমের চক্র ব্যাহত হয়, অনিদ্রা দেখা দেয় এবং শরীরের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে।গবেষণায় আরও বলা হচ্ছে, দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে মস্তিষ্কের নিউরাল কার্যক্রমেও পরিবর্তন ঘটে। বিশেষ করে স্মৃতি সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ডেনড্রাইটিক স্পাইন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা শেখার ক্ষমতা ও তথ্য মনে রাখার দক্ষতা কমিয়ে দেয়। নিয়মিত অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে মনোযোগের ঘাটতি, মানসিক ক্লান্তি এবং জ্ঞানগত কার্যকারিতা হ্রাস পাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।রাতে স্মার্টফোন ব্যবহারের অভ্যাস শরীরে প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন বাড়াতে পারে বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে। এর সঙ্গে বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং মেজাজ পরিবর্তনের মতো মানসিক সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্ক্রিন-নির্ভর জীবনযাপন মস্তিষ্কে এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে মানসিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।অন্যদিকে সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় অন্ত্রের স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহার ঘুমের ঘাটতি তৈরি করে, যা অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। এই ব্যাকটেরিয়া বা মাইক্রোবায়োম শরীরের সেরোটোনিন উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত, যা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এর ভারসাম্য নষ্ট হলে মানসিক চাপ ও হতাশার ঝুঁকি বাড়তে পারে।বিজ্ঞানীরা এ অবস্থাকে ‘ডিজিটাল ওবেসিটি’ হিসেবেও উল্লেখ করছেন। তাঁদের মতে, মস্তিষ্ক ক্রমাগত তথ্যের চাপের মধ্যে থাকলেও পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ পাচ্ছে না। এতে দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তি, ঘুমের সমস্যা এবং মস্তিষ্কে প্রদাহজনিত পরিবর্তন দেখা দিতে পারে, যা দ্রুত বার্ধক্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।এছাড়া ক্রমাগত নোটিফিকেশন ও সোশ্যাল মিডিয়ার উদ্দীপনা মস্তিষ্ককে অভ্যস্ত করে তোলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া ও অতিরিক্ত উত্তেজনার প্রতি। ফলে বাস্তব জীবনের তুলনায় ভার্চ্যুয়াল উদ্দীপনার প্রতি নির্ভরতা বাড়ে, যা আচরণগত পরিবর্তন ও আসক্তির মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।তবে গবেষকরা বলছেন, এই ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। এর জন্য জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি। নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলা, ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে সব ধরনের স্ক্রিন ব্যবহার বন্ধ রাখা এবং নির্দিষ্ট সময় পর ক্যাফেইন গ্রহণ এড়িয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় ঘুমানো ও স্ক্রিন ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা বজায় রাখলে শরীরের জৈবিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে।বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে সচেতন জীবনযাত্রার ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলেই স্মার্টফোনের ক্ষতিকর প্রভাব অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।

স্মার্টফোন কি অকালে বুড়ো বানাচ্ছে?