বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ কতটা নিরাপদ
বর্তমান সময়ে সুস্থ থাকার সহজ সমাধান হিসেবে অনেকেই ভিটামিন ও বিভিন্ন ধরনের সাপ্লিমেন্টের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। সামান্য ক্লান্তি, চুল পড়া বা শরীর ব্যথার মতো সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অভ্যাস যেমন সাধারণ মনে হয়, বাস্তবে ততটাই ঝুঁকিপূর্ণ।পুষ্টিবিদ ইসরাত জাহান ডরিন বলেন, শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে ভিটামিন ও খনিজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলো ঘাটতি না বুঝে বা পরীক্ষা ছাড়া গ্রহণ করলে উপকারের বদলে ক্ষতি হতে পারে। অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, বয়স বা জীবনযাত্রার কারণে ঘাটতি তৈরি হলে সাপ্লিমেন্ট কার্যকর ভূমিকা রাখে, তবে তা অবশ্যই নির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী হওয়া উচিত।ভিটামিন এ নিয়ে তিনি জানান, দৃষ্টিশক্তি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই দীর্ঘদিন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করেন। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দৈনিক নির্ধারিত মাত্রা যথাক্রমে পুরুষদের জন্য ৯০০ মাইক্রোগ্রাম এবং নারীদের জন্য ৭০০ মাইক্রোগ্রাম। খাদ্য যেমন ডিম, দুধ, গাজর, কুমড়া ও পালং শাক থেকে সহজেই এই ভিটামিন পাওয়া যায়। অতিরিক্ত সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে বমিভাব, মাথাব্যথা এমনকি লিভারের ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।ভিটামিন ডি প্রসঙ্গে পুষ্টিবিদ বলেন, হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষায় এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও বর্তমানে এটি সবচেয়ে বেশি অপব্যবহৃত সাপ্লিমেন্টগুলোর একটি। অনেকেই শরীর ব্যথা বা ক্লান্তি হলেই নিজে থেকে ভিটামিন ডি গ্রহণ শুরু করেন। অথচ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ঘাটতি নিশ্চিত না করে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়। অতিরিক্ত ভিটামিন ডি শরীরে ক্যালসিয়াম জমা করে হাইপারক্যালসেমিয়ার মতো জটিলতা তৈরি করতে পারে, যা কিডনি ও হৃদযন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর।আয়রন সাপ্লিমেন্ট নিয়েও সতর্ক করেন তিনি। আয়রন রক্তশূন্যতা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তবে এটি প্রয়োজন ছাড়াই দীর্ঘদিন গ্রহণ করলে শরীরে জমে গিয়ে লিভারসহ বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে। কারণ অতিরিক্ত আয়রন সহজে শরীর থেকে বের হয় না। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ ঝুঁকিপূর্ণ।কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি ত্বক, চুল ও নখের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য জনপ্রিয় হলেও এর প্রয়োজনীয়তা সবার জন্য এক নয়। অনেক ক্ষেত্রে সুষম খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমেই শরীর নিজে কোলাজেন তৈরি করতে সক্ষম। তাই কেবল ট্রেন্ড অনুসরণ করে এই ধরনের সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়।বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেকেই মনে করেন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ মানেই সুস্থ থাকা। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। বরং অপ্রয়োজনীয় সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ শরীরের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।পুষ্টিবিদ ইসরাত জাহান ডরিন বলেন, সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের আগে খাদ্যাভ্যাস মূল্যায়ন, প্রয়োজনে ল্যাব টেস্ট এবং তারপর বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ উপায়। “বেশি নিলেই বেশি উপকার”—এই ধারণা ভুল এবং বিপজ্জনক। সঠিক মাত্রা, সঠিক কারণ ও সঠিক সময় অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করাই নিরাপদ।তিনি আরও বলেন, প্রাকৃতিক ও সুষম খাদ্যই শরীরের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পুষ্টির উৎস। বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখলে অনেক ক্ষেত্রেই সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজন হয় না।বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতা ছাড়া সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ শরীরের জন্য সহায়ক না হয়ে বরং ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তাই সুস্থ থাকতে হলে আগে খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।#আরএ