ঢাকা    শনিবার, ০২ মে ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

যুদ্ধ যেভাবে কলঙ্কিত করে বিজ্ঞানীদের কষ্টার্জিত আবিষ্কারকে

মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যতটা আশীর্বাদ বয়ে এনেছে, ততটাই বিতর্ক ও নৈতিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে তার ব্যবহার। গবেষণাগারে মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে জন্ম নেওয়া বহু আবিষ্কারই শেষ পর্যন্ত রূপ নিয়েছে ধ্বংসযন্ত্রে। আধুনিক যুদ্ধ এখন আর কেবল অস্ত্রের সংঘর্ষ নয়, বরং এটি প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্যাটেলাইট ও নিখুঁত লক্ষ্যভেদী ব্যবস্থার এক জটিল সমন্বয়।রাডার প্রযুক্তির পথিকৃৎ ব্রিটিশ বিজ্ঞানী রবার্ট ওয়াটসন ওয়াট মূলত আবহাওয়া ও বায়ুমণ্ডল পর্যবেক্ষণের জন্য গবেষণা শুরু করেছিলেন। কিন্তু তার উদ্ভাবিত প্রযুক্তি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় শত্রু বিমানের গতিবিধি শনাক্তের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে ওঠে। বিজ্ঞানীর শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্য পরিণত হয় যুদ্ধের কৌশলগত শক্তিতে।একইভাবে জার্মান বংশোদ্ভূত রকেট বিজ্ঞানী ভের্নার ফন ব্রাউন স্বপ্ন দেখতেন মহাকাশ অভিযানের। কিন্তু তার তৈরি ভি-২ রকেট ব্যবহৃত হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসাত্মক অস্ত্র হিসেবে, যা ইউরোপের বহু শহরে প্রাণহানি ও বিপর্যয় ঘটায়। পরবর্তীতে তিনি মহাকাশ কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও যুদ্ধকালীন ব্যবহার তাকে গভীর অনুশোচনায় ফেলে দেয়।আজকের আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম ভিত্তি গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস)। মার্কিন বিজ্ঞানী ইভান গেটিংয়ের তাত্ত্বিক ধারণা ও গবেষণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই প্রযুক্তি মূলত মানুষের নেভিগেশন ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সহজ করার জন্য তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আজ এই জিপিএসই ব্যবহৃত হচ্ছে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের নির্ভুল লক্ষ্যভেদের জন্য, যা যুদ্ধকে আরও মারাত্মক ও নিখুঁত করে তুলেছে।অন্যদিকে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভিত্তি স্থাপন করেন ব্রিটিশ গণিতবিদ অ্যালান টিউরিং। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি কোড ভাঙার মাধ্যমে তিনি লাখো প্রাণ রক্ষা করেছিলেন। কিন্তু তারই ধারণা ও প্রযুক্তিগত উত্তরাধিকার আজ স্বয়ংক্রিয় ড্রোন হামলা ও যুদ্ধ ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত হচ্ছে, যা মানুষের সিদ্ধান্ত ছাড়াই প্রাণঘাতী আঘাত হানতে সক্ষম।পারমাণবিক অস্ত্রের ইতিহাসে জে রবার্ট ওপেনহাইমার এবং আলবার্ট আইনস্টাইনের নাম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ওপেনহাইমারের নেতৃত্বে তৈরি হয় বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক বোমা, যার ভয়াবহতা তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। অন্যদিকে আইনস্টাইন যুদ্ধকালীন সময়ে গবেষণাকে উৎসাহ দিলেও পরবর্তীতে পারমাণবিক অস্ত্রের ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা দেখে অনুতপ্ত হন।আধুনিক যুগে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত প্রযুক্তিগুলো—স্টিলথ যুদ্ধবিমান, সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্যাটেলাইট-নির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা—সবই মূলত বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ফল। কিন্তু এই অগ্রগতি মানবতার কল্যাণের বদলে অনেক সময় ধ্বংসের হাতিয়ার হয়ে উঠছে।বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তি নিজে কখনো নিরপেক্ষ নয়; এর ব্যবহার নির্ধারণ করে মানুষের সিদ্ধান্ত ও নৈতিকতা। ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়াহ হারারি মনে করেন, মানবজাতি প্রযুক্তিগতভাবে অসীম শক্তির অধিকারী হলেও নৈতিকভাবে এখনো পরিপক্ব হয়নি। একইভাবে স্টিফেন হকিং সতর্ক করেছিলেন, প্রযুক্তির অগ্রগতি যদি মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রাখে, তবে তা মানবসভ্যতার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।আজকের যুদ্ধগুলো প্রমাণ করছে, বিজ্ঞানীদের নিরলস পরিশ্রমে তৈরি জ্ঞান ও আবিষ্কার কত সহজেই রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থে ব্যবহৃত হয়ে যায়। যে প্রযুক্তি একসময় মানুষের জীবন সহজ করার জন্য তৈরি হয়েছিল, সেটিই এখন অনেক ক্ষেত্রে জীবনহানির প্রধান মাধ্যম।শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি প্রযুক্তির নয়, বরং মানুষের ব্যবহারের নৈতিকতার। বিজ্ঞানীরা স্বপ্ন দেখেছিলেন অগ্রগতির, কিন্তু সেই অগ্রগতি যদি ধ্বংসের পথে ব্যবহৃত হয়, তবে তার দায় প্রযুক্তির নয়—দায় মানুষের সিদ্ধান্তের।

যুদ্ধ যেভাবে কলঙ্কিত করে বিজ্ঞানীদের কষ্টার্জিত আবিষ্কারকে