২০২৭ সালের মধ্যে রাখাইন দখলের ঘোষণা আরাকান আর্মির
মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে সামরিক জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইরত সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ) এবার পুরো প্রদেশ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ তারা রাখাইনে ‘চূড়ান্ত বিজয়’ অর্জন করতে চায়। এই ঘোষণা মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।আরাকান আর্মির প্রধান কমান্ডার-ইন-চিফ মেজর জেনারেল টুয়ান ম্রাত নাইং গত শুক্রবার সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, পূর্ণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে প্রয়োজনীয় সব কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হবে এবং সামরিক জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে মিত্রদের সঙ্গে যৌথভাবে লড়াই অব্যাহত থাকবে।মিয়ানমারভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, আরাকান আর্মি ইতোমধ্যে রাখাইন প্রদেশের ১৪টি টাউনশিপ এবং দক্ষিণ চিন প্রদেশের পালেৎওয়া টাউনশিপ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে ধারাবাহিক সামরিক অভিযানের মাধ্যমে এসব এলাকায় তাদের প্রভাব বিস্তার ঘটে।বর্তমানে রাখাইন প্রদেশের মাত্র তিনটি গুরুত্বপূর্ণ টাউনশিপ—রাজধানী সিট্যুয়ে, কিয়াউকফিউ এবং মানাউং—এখনও জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর মধ্যে কিয়াউকফিউকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়, কারণ সেখানে গভীর সমুদ্রবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামো রয়েছে। ফলে এসব এলাকা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও তীব্র সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে।আরাকান আর্মি জানায়, ২০২৩ সালের ১৩ নভেম্বর তারা রাখাইনে বড় আকারের অভিযান শুরু করে। এর কয়েক সপ্তাহ আগে উত্তর শান প্রদেশে তাদের মিত্র সংগঠনগুলোর জোট ‘ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স’ অপারেশন ১০২৭ শুরু করেছিল। এরপর দেশজুড়ে জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ আরও জোরদার হয়।সাম্প্রতিক সময়ে আরাকান আর্মি শুধু সামরিক সাফল্যই অর্জন করেনি, বরং নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় প্রশাসনিক কাঠামোও গড়ে তুলেছে। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, তারা সেখানে আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু করেছে। এর মাধ্যমে তারা নিজেদেরকে বিকল্প শাসনব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।তবে রাখাইনের পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত অস্থিতিশীল। জান্তা সরকারের বিমান হামলা, নৌ হামলা এবং ভারী অস্ত্র ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে। এতে বহু বেসামরিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় মানবিক সংকট বাড়ছে। অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এলাকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে।আরাকান আর্মির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের অন্য দুই সংগঠন—মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স আর্মি এবং তা’আং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি—শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছে। এছাড়া ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট, কমিটি রিপ্রেজেন্টিং পিয়িদাউংসু হ্লুটাওসহ ৪০টির বেশি প্রতিরোধ গোষ্ঠী তাদের অগ্রগতিকে অভিনন্দন জানিয়েছে।পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আরাকান আর্মির এই অগ্রযাত্রা মিয়ানমারের সামরিক সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে রাখাইন উপকূলীয় অঞ্চল, সীমান্ত বাণিজ্যপথ এবং জ্বালানি করিডোরের নিয়ন্ত্রণ হারালে জান্তা সরকারের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হতে পারে।বাংলাদেশের জন্যও এ পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। রাখাইন রাজ্য বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় সংঘাত বাড়লে নতুন করে সীমান্ত উত্তেজনা, অনুপ্রবেশ ও শরণার্থী সংকট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ইতোমধ্যে কক্সবাজার ও টেকনাফ সীমান্তে নিরাপত্তা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।বিশ্লেষকদের মতে, আরাকান আর্মির ঘোষিত লক্ষ্য পূরণে আগামী এক থেকে দেড় বছর রাখাইন অঞ্চল আরও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মুখোমুখি হতে পারে। রাজনৈতিক সমাধানের উদ্যোগ না এলে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ আরও জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।সূত্র: মিয়ানমার নাউ#আরএ