ডিজিটাল সংস্কারে বদলে গেছে বিপিএসসি, ব্যয় কমেছে ৮০%
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (বিপিএসসি) নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ডিজিটাল সংস্কার এনে সময়, ব্যয় ও জট কমানোর দাবি করেছে। কমিশনের সাম্প্রতিক বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন থেকে শুরু করে ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ধাপেই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা চালুর ফলে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। এতে কোথাও ৬০ শতাংশ, কোথাও ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় সাশ্রয় সম্ভব হয়েছে।অক্টোবর ২০২৪ সালে পুনর্গঠিত কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, গতি এবং দক্ষতা বাড়াতে একাধিক সংস্কার কার্যক্রম শুরু করে। দীর্ঘদিন ধরে বিসিএস পরীক্ষা ও অন্যান্য নিয়োগ পরীক্ষার ফল প্রকাশে বিলম্ব, প্রশ্নপত্র ব্যবস্থাপনায় উচ্চ ব্যয় এবং প্রশাসনিক জটিলতা নিয়ে নানা সমালোচনা ছিল। নতুন কমিশন সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রশ্নপত্র প্রণয়নের ক্ষেত্রে ইন-হাউস প্রোটোকল চালুর ফলে ব্যয় প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে। আগে বিভিন্ন বাহ্যিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীলতা থাকলেও এখন নিজস্ব তত্ত্বাবধানে নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় প্রশ্ন প্রস্তুত করা হচ্ছে। এতে খরচ কমার পাশাপাশি গোপনীয়তা ও জবাবদিহিও বেড়েছে বলে মনে করছে কমিশন।সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে প্রশ্নপত্র মুদ্রণে। নিজস্ব ডিজিটাল প্রিন্টিং সুবিধা চালুর ফলে মুদ্রণ ব্যয় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরীক্ষার পরিমাণ, প্রশ্নপত্রের সংখ্যা ও নিরাপত্তা বিবেচনায় এটি বিপিএসসির জন্য বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।পরীক্ষার্থীদের জন্যও এসেছে স্বস্তির খবর। প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় আবেদনকারীপ্রতি ব্যয় ৭৮ শতাংশ কমানো হয়েছে। পাশাপাশি আবেদন ফি ৭০০ টাকা থেকে কমিয়ে ২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে সাধারণ ও নিম্নআয়ের চাকরিপ্রত্যাশীদের ওপর আর্থিক চাপ অনেকটাই কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।কমিশন জানিয়েছে, দায়িত্ব নেওয়ার সময় ৪৪তম থেকে ৪৬তম বিসিএস পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে জটিলতা ও বিলম্ব ছিল। সেই জট ধাপে ধাপে নিরসন করা হয়েছে। এখন বিপিএসসির নতুন লক্ষ্য হচ্ছে ‘ওয়ান বিসিএস, ওয়ান ইয়ার’ মডেল চালু করা। অর্থাৎ একটি বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি থেকে চূড়ান্ত ফলাফল পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া এক বছরের মধ্যে শেষ করা। ৫০তম বিসিএস থেকে এই চক্র কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।এ ছাড়া ৪৭তম বিসিএস নতুন সংস্কার প্রোটোকলের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। কমিশনের আশা, এই মডেল সফল হলে ভবিষ্যতের নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য হবে।খাতা মূল্যায়নেও গতি এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। আগে লিখিত পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে দীর্ঘ সময় লাগলেও এখন তা কয়েক মাস থেকে কমিয়ে মাত্র তিন মাসে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা প্রায় ৭৫ শতাংশ সময় সাশ্রয়ের সমান। পরীক্ষার্থীদের দীর্ঘ অপেক্ষা কমাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশেও এসেছে বড় পরিবর্তন। আগে বিভিন্ন প্রশাসনিক ধাপের কারণে কয়েক মাস সময় লাগলেও এখন অটোমেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে এক সপ্তাহের মধ্যে ফল প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে বলে জানিয়েছে কমিশন। এতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার অনিশ্চয়তা কমবে এবং প্রার্থীরাও দ্রুত পরবর্তী পরিকল্পনা নিতে পারবেন।মৌখিক পরীক্ষায়ও কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। ভাইভা নম্বর ২০০ থেকে কমিয়ে ১০০ করা হয়েছে। কমিশনের মতে, এতে লিখিত পরীক্ষার মেধার প্রতিফলন বাড়বে এবং ব্যক্তিনির্ভর বৈষম্যের সুযোগ কমবে।বিপিএসসি ২০২৫-২০২৯ মেয়াদের জন্য প্রথমবারের মতো পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনাও গ্রহণ করেছে। প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসতে পারে।#আরএ