জয়-পরাজয়ের মাঝেও বেঁচে থাকার গল্প: ‘দহন’
একজন শিক্ষিত বেকার যুবক। সংসারে অভাব। প্রতিদিন নতুন করে বাঁচার সংগ্রাম। স্বপ্ন আছে, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের পথ নেই। ১৯৮৫ সালে নির্মিত শেখ নিয়ামত আলীর চলচ্চিত্র ‘দহন’ মূলত এমনই এক মানুষের গল্প, যে গল্পে শুধু একজন মুনির নয়, বরং একটি সময়ের মধ্যবিত্ত সমাজের দীর্ঘশ্বাস ধরা আছে।বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে ‘দহন’ এমন একটি সিনেমা, যা বিনোদনের গণ্ডি পেরিয়ে সমাজের বাস্তবতাকে নির্মোহভাবে তুলে ধরেছে। চার দশক আগে নির্মিত হলেও ছবিটির অনেক দৃশ্য আজও বিস্ময়করভাবে প্রাসঙ্গিক।চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্র মুনির—একজন শিক্ষিত কিন্তু বেকার তরুণ। টিউশনি করে কোনোভাবে সংসার চালানোর চেষ্টা করে সে। পরিবারের দায়িত্ব, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং অর্থনৈতিক সংকট তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফেরে। শহরের ব্যস্ত রাস্তাঘাট, শ্রমজীবী মানুষের ক্লান্ত মুখ, ফুটপাতে রাত কাটানো মানুষ আর অন্যদিকে বিত্তশালীদের বিলাসী জীবন—এই বৈপরীত্যের মধ্যেই মুনিরের জীবন এগিয়ে চলে।চাকরির আশা ছেড়ে একসময় ব্যবসায় নামতে চায় মুনির। বন্ধুর কাছ থেকে ধার করা অর্থ নিয়ে নতুন শুরুর স্বপ্ন দেখে। কিন্তু সেই স্বপ্নও বেশিদিন টেকে না। প্রতারণা, ব্যর্থতা আর হতাশা তাকে আরও গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। তার ব্যক্তিগত সংকটের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের ভাঙা স্বপ্নও। অর্থাভাবে ছোট বোনের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় সম্পর্কের টানাপোড়েন—এসব দৃশ্য দর্শককে নাড়া দেয়।ছবিতে মুনির ও তার ছাত্রী আইভির সম্পর্কের একটি সূক্ষ্ম আবেগী রেখা রয়েছে। তবে নির্মাতা প্রেমের গল্পের চেয়ে সমাজের বৃহত্তর সংকটকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে ব্যক্তিগত অনুভূতির চেয়ে সামাজিক বাস্তবতাই হয়ে ওঠে ছবির প্রধান চরিত্র।চলচ্চিত্রটির অন্যতম শক্তিশালী দিক এর পার্শ্বচরিত্রগুলো। বিশেষ করে মুনিরের মামা চরিত্রটি। রাজনীতি ও দেশপ্রেমের বড় বড় কথা বলা এই মানুষটির কথাবার্তা এবং বাস্তব জীবনের আচরণের মধ্যে যে ফারাক, তা সমাজের এক পরিচিত চেহারাকে সামনে নিয়ে আসে। একইভাবে সত্যভিত্তিক লেখা প্রকাশে অনাগ্রহী এক সম্পাদকের চরিত্র স্বাধীন গণমাধ্যমের সীমাবদ্ধতা ও আপসকামিতার প্রশ্নও উত্থাপন করে।শেখ নিয়ামত আলী অত্যন্ত সংযত অথচ শক্তিশালী নির্মাণশৈলীতে গল্পটি তুলে ধরেছেন। প্রতীকী দৃশ্য, বাস্তবধর্মী সংলাপ এবং পরিবেশের ব্যবহার চলচ্চিত্রটিকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে। বিশেষ করে শেষ দৃশ্যে রক্তাক্ত হাতে জানালার ভাঙা কাঁচ সরানোর চেষ্টা যেন একটি প্রতীক—অবরুদ্ধ মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, অদৃশ্য দেয়াল ভাঙার প্রতীক।জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তিনটি বিভাগে পুরস্কৃত ‘দহন’ শুধু একটি সিনেমা নয়; এটি একটি সময়ের দলিল। বুলবুল আহমেদ, ববিতা, হুমায়ুন ফরীদি, শর্মিলী আহমেদ, প্রবীর মিত্র, ডলি আনোয়ার, রওশন জামিল, আসাদুজ্জামান নূরসহ শক্তিশালী অভিনয়শিল্পীদের অভিনয় ছবিটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।আজকের বাংলাদেশেও যখন বেকারত্ব, বৈষম্য এবং মধ্যবিত্তের নীরব সংগ্রাম বাস্তবতার অংশ, তখন ‘দহন’ কেবল অতীতের গল্প হয়ে থাকে না। বরং এটি আমাদের বর্তমানকেও নতুন করে ভাবতে শেখায়। সময় বদলেছে, কিন্তু মুনিরদের লড়াই যেন এখনও শেষ হয়নি।লেখকঃ মিম, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।#আর ইউ এস