পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বিভক্তি ও ভাঙনের আশঙ্কা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। দলীয় বৈঠকে বিধায়কদের উপস্থিতি কমে যাওয়া, দুই বিধায়কের বহিষ্কার এবং “আসল তৃণমূল” পরিচয় ঘিরে নতুন বিতর্ক রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ পরিস্থিতিকে মহারাষ্ট্রের শিবসেনা বা এনসিপির বিভক্তির মতো সম্ভাব্য ঘটনার সঙ্গে তুলনা করছেন।নির্বাচনে পরাজয়ের পর দলটি দুই ভাগে বিভক্ত হতে পারে—এমন আলোচনা এখন রাজনৈতিক মহলে জোরালো। “আসল তৃণমূল” বনাম “তৃণমূল”—এ ধরনের বিভাজনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না পর্যবেক্ষকেরা। এর মধ্যেই দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।এদিকে কালীঘাটের বাসভবনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা জয়ী বিধায়কদের বৈঠকে মাত্র ২১ জনের উপস্থিতি দেখা যায়। অনুপস্থিত বিধায়কদের নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তাদের উদ্দেশে “মীরজাফর” মন্তব্য করেন তিনি। একই সময়ে শহরের একটি হোটেলে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে পৃথক বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকের পর কয়েকজন বিধায়ক সরে দাঁড়িয়ে জানান, তারা মমতার সঙ্গেই থাকতে চান।দলের একাংশের মধ্যে দুর্নীতির মামলাকে কেন্দ্র করে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীন নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত থাকলে আইনি জটিলতা বাড়তে পারে। এ কারণে কিছু নেতা বিকল্প রাজনৈতিক অবস্থানের কথাও বিবেচনা করছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।গত কয়েক বছর ধরেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে “কালীঘাট বনাম ক্যামাক স্ট্রিট” এবং “নবীন বনাম প্রবীণ” দ্বন্দ্বের আলোচনা চলছে। এখন “আমরাই আসল তৃণমূল” স্লোগান তুলে দলের ভেতরের একটি অংশ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।ক্ষমতায় থাকার সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা বৈঠকে প্রায় শতভাগ উপস্থিতি থাকলেও এখন পরিস্থিতি বদলেছে। সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোতে প্রায় ৬০ শতাংশ বিধায়ক অনুপস্থিত থাকছেন বলে দাবি করা হচ্ছে, যা দলীয় অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সরাসরি বিজেপিতে না গিয়ে কিছু নেতা মহারাষ্ট্রের একনাথ শিন্ডে বা অজিত পাওয়ারের মতো আলাদা গোষ্ঠী গড়ে তুলতে পারেন। সেই সম্ভাবনাই তৃণমূলের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের বিষয়টি নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করার জন্য জমা দেওয়া চিঠিতে একাধিক বিধায়কের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় কয়েকজন বিধায়কের বাড়িতে তদন্তকারীরা যান এবং দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গেও যোগাযোগ করেন।মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, এই অভিযোগ নিয়েই বিধানসভায় লিখিত অভিযোগ করেছিলেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা, যার পরিণতিতে তাদের বহিষ্কার করা হয়।পরবর্তীতে সোমবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কঠোর অবস্থান নিয়ে জানান, কিছু নেতা বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে দলের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।রাজনৈতিক ইতিহাসে দল ভাঙা বা নতুন দল গঠনের ঘটনা নতুন নয়। একসময় কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৯৮ সালে গঠিত দলটি প্রায় তিন দশকে পশ্চিমবঙ্গের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হলেও ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর এখন তা অভ্যন্তরীণ সংকটে পড়েছে। বর্তমানে ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে একটি অংশ প্রকাশ্যে বিদ্রোহী অবস্থানে রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তা নিয়েই এখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।