২০২৭-এর জানুয়ারিতে এসএসসি, চাপে শিক্ষার্থী-অভিভাবক
২০২৭ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা আগামী ৭ জানুয়ারি শুরু করার সরকারি সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রতি বছর সাধারণত ফেব্রুয়ারি বা মার্চের দিকে এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও এবার তা প্রায় তিন মাস এগিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।সরকারের দাবি, দীর্ঘদিনের সেশনজট নিরসন এবং শিক্ষাবর্ষকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফিরিয়ে আনতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের অনেকে বলছেন, পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সুযোগ না দিয়েই এমন সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
বই পেতে বিলম্বসহ নানা কারণে ব্যাহত শ্রেণি কার্যক্রমচলতি শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীরা হাতে বই পেয়েছে মার্চ মাসে। এরপর রমজানের ছুটি, চলমান এসএসসি পরীক্ষা, ঈদুল আজহার ছুটি এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কারণে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এখনো অনেক বিষয়ে সিলেবাস সম্পন্ন করতে পারেনি।এ বিষয়ে রাজশাহীর ধোপাঘাটা আলহাজ কলিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আনভিয়া সুলতানা বলেন, এতদিন তারা মার্চ বা এপ্রিলকে সামনে রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। হঠাৎ জানুয়ারিতে পরীক্ষা নির্ধারণ করায় তারা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আরও অনেক শিক্ষার্থী। তাদের দাবি, পর্যাপ্ত ক্লাস না হওয়ায় এখন কোচিং বা ব্যক্তিগত প্রস্তুতির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
শিক্ষকরাও তুলছেন প্রশ্নশিক্ষকদের একটি অংশও সিদ্ধান্তটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ঢাকার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রেজাউল ইসলাম বলেন, বছরের প্রথম ছয় মাসে তেমন কার্যকর ক্লাসই হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের বোর্ড পরীক্ষার জন্য যথাযথভাবে প্রস্তুত করা কঠিন হবে।আরেক শিক্ষক মোহাম্মদ জুয়েল রানা বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষার্থীরা করোনা মহামারি, কারিকুলাম পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব মোকাবিলা করেছে। এর মধ্যেই হঠাৎ পরীক্ষা এগিয়ে আনা হলে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ আরও বাড়বে।
অভিভাবক মহলেও উদ্বেগঅভিভাবকরাও হঠাৎ পরীক্ষা এগিয়ে আনার সিদ্ধান্তটি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে রয়েছেন। তাদের মতে, সেশনজট কমানো জরুরি হলেও একটি নির্দিষ্ট ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ওপর পুরো চাপ চাপিয়ে দেওয়া অযৌক্তিক। এতে কোচিংনির্ভরতা বৃদ্ধি এবং মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে।
সরকারের ভিন্ন অবস্থানতবে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে উদ্বেগ থাকলেও, এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সরকারের অবস্থান ভিন্ন।শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে ডিসেম্বরের মধ্যে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। তার মতে, সেশনজটের কারণে শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে, যা দেশের জনমিতিক সক্ষমতার জন্যও ক্ষতিকর।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যশিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের ভাষায়, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যথাযথভাবে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা ও সক্ষমত নিরূপণ করা জরুরি।শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী মনে করেন, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে তৃণমূল পর্যায়ের বাস্তবতা আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন ছিল। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট–এর অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিনুর রশীদ বলছেন, সময়মতো শিক্ষা কার্যক্রম শেষ করতে হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষা ক্যালেন্ডার স্বাভাবিক ধারায় ফেরানো প্রয়োজন হলেও তা হতে হবে পরিকল্পিত ও ধাপে ধাপে। অন্যথায় শিক্ষার্থীদের শেখার মানের চেয়ে পরীক্ষার চাপই বড় হয়ে উঠবে।সূত্র: বিবিসি বাংলা