যুদ্ধের পরও অনমনীয় ইরানিরা, ক্ষেপণাস্ত্র-ইউরেনিয়াম ছাড়ে ‘না’
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের সঙ্গে ৪০ দিনের সংঘাতের পর পরিচালিত এক দেশব্যাপী জরিপে উঠে এসেছে ইরানের জনগণের দৃঢ় অবস্থান। সামরিক সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং হরমুজ প্রণালির কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়ে ছাড় দিতে নারাজ দেশটির অধিকাংশ নাগরিক। ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিং (আইআরআইবি) গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালিত এ জরিপে দেখা যায়, যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতেও জাতীয় প্রতিরক্ষা প্রশ্নে আপসহীন অবস্থানে রয়েছে ইরানি সমাজ।জরিপে অংশ নেওয়া বিপুল সংখ্যক উত্তরদাতা মনে করেন, এমন কোনো চুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়, যেখানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পে বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণের শর্ত থাকবে কিংবা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে বলা হবে। একইভাবে হরমুজ প্রণালিতে অবাধ আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের প্রশ্নেও জনগণের বড় অংশ আপত্তি জানিয়েছেন।পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৮৫ দশমিক ৭ শতাংশ উত্তরদাতা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতার বিরোধিতা করেছেন। ৮২ দশমিক ৬ শতাংশ নাগরিক ৪০০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণের বিপক্ষে মত দিয়েছেন। ৭৯ দশমিক ৪ শতাংশ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের বিরোধিতা করেছেন। এছাড়া ৭৩ দশমিক ৭ শতাংশ অংশগ্রহণকারী হরমুজ প্রণালিতে অবাধ জাহাজ চলাচলের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণত যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জনগণ শান্তির স্বার্থে আপসের পক্ষে ঝুঁকে পড়ে। তবে ইরানের ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো প্রবণতা। জনগণ প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে কেবল সামরিক উপকরণ হিসেবে নয়, বরং জাতীয় মর্যাদা, স্বাধীনতা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে দেখছে। ফলে এসব বিষয়ে ছাড় দেওয়াকে তারা রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করছে।যুদ্ধবিরতির প্রয়োজন কার বেশি ছিল—এই প্রশ্নেও স্পষ্ট মতামত উঠে এসেছে জরিপে। ৫৭ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, যুদ্ধবিরতির প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রের বেশি ছিল। মাত্র ৯ দশমিক ৮ শতাংশের মতে, ইরানের প্রয়োজন বেশি ছিল। আর ২৯ শতাংশ বলেছেন, উভয় পক্ষেরই সমান প্রয়োজন ছিল।এছাড়া ৬৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারী মনে করেন, ৪০ দিনের সংঘাতে ইরানই বিজয়ী হয়েছে। একই সঙ্গে ৮৭ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ দেশটির সামরিক বাহিনীর পারফরম্যান্সকে ‘শক্তিশালী’ বা ‘অত্যন্ত শক্তিশালী’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। এটি যুদ্ধোত্তর জনমনে রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রতি উচ্চ আস্থার প্রতিফলন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।জরিপে আরও দেখা গেছে, ৪৫ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ যুদ্ধ চলাকালে কিংবা যুদ্ধের পর রাতের সমাবেশ, মিছিল বা গাড়িবহরে অংশ নিয়েছেন। আরও ১৩ দশমিক ২ শতাংশ অন্তত এক বা দুইবার এসব কর্মসূচিতে অংশ নেন। অর্থাৎ, অর্ধেকেরও বেশি জনগণ প্রকাশ্যে রাষ্ট্রীয় সংহতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।দেশের ভবিষ্যৎ নিয়েও আশাবাদী ইরানিরা। ৭১ দশমিক ৭ শতাংশ উত্তরদাতা বিশ্বাস করেন, যুদ্ধের পর ইরানের ভবিষ্যৎ আরও উন্নত হবে। মাত্র ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ মনে করেন, পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ৬৭ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ রাতের সমাবেশ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।বিশ্লেষকদের ভাষ্য, এ জরিপে এমন একটি সমাজের চিত্র ফুটে উঠেছে, যারা বাহ্যিক চাপের মুখে ভেঙে পড়ার বদলে আরও ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। সামরিক শক্তির পাশাপাশি ‘সামাজিক প্রতিরোধ’ এখন ইরানের জাতীয় শক্তির গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক আলোচনায়ও এ ধরনের জনসমর্থন দেশটির কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।#আর