ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

নিকলীতে​ দেশসেরা বীর সন্তানদের ঘর নির্মাণ প্রকল্পে বিষাক্ত ঘুষের ছায়া।

​কিশোরগঞ্জের হাওরবেষ্টিত নিকলী উপজেলায় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান গৃহহীন ও অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি ও আবাসন নিশ্চিতকরণের জন্য সরকারের নেওয়া মহতী উদ্যোগ ঘিরে চরম ক্ষোভ, অরাজকতা ও তুলকালাম কাণ্ড শুরু হয়েছে। প্রায় ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন 'বীর নিবাস' নির্মাণ প্রকল্পে এক সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরাসরি ১৫ লাখ টাকা নগদ ঘুষ দাবির চাঞ্চল্যকর অভিযোগে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে জেলাজুড়ে।​অভিযোগের তীক্ষ্ণ তীর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) দেলোয়ার হোসেনের দিকে। ঘুষের দাবি করা টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় প্রথম দফায় বিধিসম্মতভাবে কাজ পাওয়া বৈধ সর্বনিম্ন দরদাতাকে কার্যাদেশ (Work Order) না দিয়ে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়া বাতিল ও পুনরায় দরপত্র আহ্বান করার নজিরবিহীন অভিযোগ উঠে এসেছে। ​দীর্ঘদিন ধরে নতুন লটারির তারিখ নির্ধারণ না করে প্রকল্পটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ঝুলিয়ে রাখায় আবাসন সুবিধা প্রাপ্তিতে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অপেক্ষার প্রহর যেমন দীর্ঘায়িত হচ্ছে, তেমনি পুনঃদরপত্রে অংশ নেওয়া ঠিকাদারদের প্রায় ১২ কোটি টাকার পে-অর্ডার ব্যাংকে আটকে থাকায় প্রতিদিন সুদের বোঝা বাড়ছে। এই ঘটনায় চরম ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক (ডিসি) সোহানা নাসরিনের নিকট লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন এবং অভিযুক্ত পিআইও-র অবিলম্বে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।​সংশ্লিষ্ট সূত্র ও লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আবাসন সুনিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ‘বীর নিবাস’ প্রকল্পের আওতায় নিকলী উপজেলায় ১৮ জন গৃহহীন ও অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধার জন্য একতলা পাকা ঘর নির্মাণের সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। প্রতিটি ঘর নির্মাণের প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয় প্রায় ২০ লাখ টাকা, যার মোট বাজেট ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। গত মে মাসে সকল নিয়মকানুন মেনে এই প্রকল্পের উন্মুক্ত দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বান করা হয়। এতে উপজেলার একাধিক তালিকাভুক্ত ও অভিজ্ঞ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। সকল সিডিউল পরীক্ষা ও কারিগরি মূল্যায়ন শেষে ‘মেসার্স হক কনস্ট্রাকশন’ নামক প্রতিষ্ঠানটি সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কাজটি পাওয়ার যাবতীয় যোগ্যতা অর্জন করে। মেসার্স হক কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী মনির হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমরা সরকারি বিধি মেনে সর্বনিম্ন দরদাতা নির্বাচিত হই। কিন্তু কার্যাদেশ দেওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে পিআইও দেলোয়ার হোসেন আমাকে অফিসে ডেকে গোপনে ১৫ লাখ টাকা নগদ ঘুষ দাবি করেন। আমি স্পষ্ট জানিয়ে দিই, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দকৃত ঘরের কাজের মান বজায় রেখে এত বিপুল পরিমাণ ঘুষ দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ঘুষ দিতে অস্বীকার করায় তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে আমার বৈধ কার্যাদেশ আটকে দেন এবং কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই রি-টেন্ডারের চক্রান্ত বাস্তবায়ন করেন।"​প্রথম দরপত্র বাতিলের পর সরকারি নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। দ্বিতীয় দফায় ৮ থেকে ১০টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এতে অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে নতুন করে বিক্রয় হওয়া ১৫৮টি সিডিউলের বিপরীতে ঠিকাদাররা তাদের দরপত্র জমা দেন। অভিযোগ রয়েছে, নিজের অনিয়ম ঢাকতে ও পছন্দসই কোনো গোষ্ঠীকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার দূরভিসন্ধিতেই এই পুনঃদরপত্রের নাটক সাজানো হয়েছে। তবে পুনঃদরপত্র জমা দেওয়ার পর এক মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও এখনো রহস্যজনক কারণে প্রকাশ্য লটারির তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী সিডিউল জমার পরপরই লটারির মাধ্যমে বিজয়ী ঠিকাদার চূড়ান্ত করার কথা থাকলেও পিআইও দেলোয়ার হোসেন নানা অজুহাতে তা পিছিয়ে দিচ্ছেন। এতে সমগ্র প্রকল্পটির বাস্তবায়ন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।​পুনঃদরপত্রে অংশ নেওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা জানান, বারবার টেন্ডার আহ্বান ও ঝুলিয়ে রাখার নাটকে তারা আর্থিক ও মানসিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। নিকলীর স্থানীয় ঠিকাদার আবু সাঈদ আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ​"একজন সরকারি কর্মকর্তার ব্যক্তিস্বার্থ ও স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তের কারণে সরকারের কোটি কোটি টাকার এই অগ্রাধিকার প্রকল্প কার্যতঃ স্থবির হয়ে পড়েছে। আমরা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে এবং জামানতের পে-অর্ডার জমা দিয়ে বসে আছি, অথচ কাজ শুরু করার কোনো লক্ষণ নেই।" অপর ঠিকাদার শফিকুজ্জামান তোফায়েল তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ​"প্রথম দরপত্রে শতভাগ স্বচ্ছতার ভিত্তিতে মেসার্স হক কনস্ট্রাকশন কাজ পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হয়েছিল। কিন্তু পিআইও ১৫ লাখ টাকা ঘুষ না পেয়ে গায়ের জোরে তা বাতিল করেন। এত বড় অঙ্কের ঘুষ দিয়ে কাজ করলে মুক্তিযোদ্ধারা কীভাবে মানসম্পন্ন ঘর পাবেন? আমরা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের সাথে বেইমানি করতে পারিনি বলেই আজ প্রশাসনিক হেনস্থার শিকার হচ্ছি। পুনঃদরপত্রে অংশ নিতে সব ঠিকাদার মিলিয়ে ১২ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের পে-অর্ডার ব্যাংকে জমা রেখে আটকে রয়েছে। দিনের পর দিন দরপত্র প্রক্রিয়া ঝুলিয়ে রাখায় ব্যাংক সুদের বোঝা আমাদের ঘাড়ের ওপর চেপে বসছে। আমরা অবিলম্বে প্রকাশ্য লটারির মাধ্যমে কাজের স্বচ্ছ বন্টন এবং দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ বিভাগীয় শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।"​এদিকে সরকারি অনুদানের ঘর পাওয়ার আশায় দিন গুনছেন এলাকার ১৮ জন অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবার। বর্ষার দিনে জরাজীর্ণ কাঁচা ভিটায় তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সরকারি এই বিশেষ আবাসন প্রকল্পের কাজ থমকে থাকায় তাদের মধ্যে চরম হতাশা ও তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।​স্থানীয় একাধিক বীর মুক্তিযোদ্ধা অশ্রুসজল চোখে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমরা জীবন বাজি রেখে দেশ স্বাধীন করেছি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সরকারের দেওয়া সম্মান হিসেবে একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই পেতে যাচ্ছি। সেখানেও যদি সরকারি কর্মচারীরা ঘুষের লোভ সামলাতে না পেরে আমাদের ঘর নির্মাণ আটকে রাখে, তবে এর চেয়ে লজ্জার আর কিছু হতে পারে না। আমরা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি—অনতিবিলম্বে ঘুষখোর কর্মকর্তাদের অপসারণ করে আমাদের বীর নিবাস নির্মাণের কাজ দ্রুত শুরু করা হোক।"​তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত পিআইও দেলোয়ার হোসেন। তিনি দাবি করেন, ​"আমার বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির উত্থাপিত সকল অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। প্রথম দরপত্রে জমা পড়া দর স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ছিল, তাই সরকারের রাজস্ব টাকা সাশ্রয় করতেই বিধিমোতাবেক রি-টেন্ডার করা হয়েছে। এবার ১৫৮টি সিডিউল বিক্রি হয়েছে এবং ৮টি সিডিউল জমা পড়েছে। কতিপয় স্বার্থান্বেষী ঠিকাদার কাজ না পেয়ে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচারে নেমেছে। সিএস (Comparative Statement) সহ প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে কিছুটা সময় লেগেছে। আগামী ১১ আগস্ট লটারির দিন ধার্য করা হয়েছে।"​তবে সাধারণ ঠিকাদার ও সচেতন মহলের প্রশ্ন—যদি সরকারের টাকা সাশ্রয়ই মূল উদ্দেশ্য হতো, তবে প্রথম দরপত্রে আইনগত কারণ না দর্শিয়ে সরাসরি বিজয়ী ঠিকাদারকে ঘুষ না দেওয়ায় কেন বাদ দেওয়া হলো? এবং কেন রি-টেন্ডারের পর এক মাসের বেশি সময় লটারি না করে ফেলে রাখা হলো? ​এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) সোহানা নাসরিন জানান, ​"নিকলী উপজেলার মুক্তিযোদ্ধাদের ঘর নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়ম ও ঘুষ দাবির বিষয়ে ঠিকাদারদের একটি লিখিত অভিযোগ আমরা হাতে পেয়েছি। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকল্প নিয়ে কোনো প্রকার অনিয়ম বা দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না। ইতিমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সামান্যতম সত্যতা পাওয়া গেলেও অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চাকরির বিধিমালা অনুযায়ী কঠোরতম আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"

নিকলীতে​ দেশসেরা বীর সন্তানদের ঘর নির্মাণ প্রকল্পে বিষাক্ত ঘুষের ছায়া।