মৃত্যুর আগেই ‘চল্লিশা’: ৫ হাজার অসহায় মানুষকে নিজ হাতে খাওয়ালেন কিশোরগঞ্জের দম্পতি।
মৃত্যুর পর স্বজন ও প্রতিবেশীদের দাওয়াত করে ‘চল্লিশা’ বা কুলখানির আয়োজন আমাদের সমাজের এক শতাব্দী প্রাচীন প্রথা। কিন্তু মরণোত্তর সেই প্রথার প্রথাগত ছক ভেঙে দিয়ে এক অভূতপূর্ব ও মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার এক দম্পতি। মৃত্যুর পর নয়, জীবিত থাকা অবস্থাতেই নিজেদের ‘চল্লিশা’র আয়োজন করে প্রায় পাঁচ হাজার অসহায়, দুঃস্থ ও নিম্ন আয়ের মানুষের মুখে তৃপ্তির আহার তুলে দিলেন তারা। উপজেলার জিনারী ইউনিয়নের বীর হাজীপুর গ্রামের রফিকুল ইসলাম (৬২) ও তাঁর স্ত্রী বেগম আক্তার (৫৫) দম্পতির এই ব্যতিক্রমী ও হ্রদয়গ্রাহী উদ্যোগ পুরো জেলাজুড়ে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।গত শুক্রবার (২৮ আগস্ট) জিনারী ইউনিয়নের বীর হাজীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে এ ব্যতিক্রমী ভোজের আয়োজন করা হয়। সকাল সাড়ে ১১টা থেকে শুরু হয়ে বিকেল ৩টা পর্যন্ত টানা চলে এই প্রীতিভোজ। অতিথিদের সুশৃঙ্খলভাবে বসিয়ে খাওয়ানোর সুবিধার্থে পুরো বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিশাল সামিয়ানা টাঙানো হয় এবং সারি সারি চেয়ার-টেবিলের বন্দোবস্ত করা হয়। একসঙ্গে প্রায় ৪০০ মানুষের বসে খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল সেখানে। দুপুরের কড়া রোদ পেরিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসা বিভিন্ন বয়সী প্রবীণ, শিশু ও নিম্ন আয়ের মানুষ পরম আনন্দে এই আয়োজনে অংশ নেন। খাবারের আয়োজনেও ছিল পূর্ণাঙ্গ ভূরিভোজের ছোঁয়া। পাত পেড়ে খেতে বসা হাজারো অতিথির জন্য মেন্যুতে ছিল সুস্বাদু গরুর মাংস, মাছের মুড়িঘণ্ট, ডাল এবং মিষ্টিমুখ করানোর জন্য পায়েস। সুবিশাল এই ভোজ সামলাতে গ্রামবাসী ও স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি রফিকুল ইসলাম নিজে মাঠে ঘুরে ঘুরে মানুষের পাতে পরম মমতায় খাবার তুলে দেন।বীর হাজীপুর গ্রামের মৃত হাতেম আলীর ছেলে রফিকুল ইসলাম পেশায় একজন কৃষক ও খুদে ব্যবসায়ী। দুই সন্তান মাসুদ মিয়া (৩০) ও রায়হান মিয়া (১৪) এবং এক কন্যাসন্তানকে নিয়ে তাঁর সংসার। দুই সন্তানই বাকপ্রতিবন্ধী। মেয়ে জামাই বাবলু মিয়া পরিবারে অন্যান্য বিষয়ে তদারকি করেন।জীবিত অবস্থায় নিজের ও স্ত্রীর চল্লিশা আয়োজনের রহস্য ও পিছনের অনুভূতির কথা জানতে চাইলে অশ্রুসজল কণ্ঠে রফিকুল ইসলাম বলেন, "আমার দুই ছেলে বাকপ্রতিবন্ধী। জীবনের শেষ সীমায় পৌঁছে প্রায়ই ভাবতাম—আমার মৃত্যুর পর এই সন্তানরা আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব কিংবা প্রতিবেশীদের ডেকে ঠিকভাবে কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারবে তো? তাদের পক্ষে কি বড় আয়োজনে মানুষকে খাওয়ানো সম্ভব হবে? সেই অজানা শঙ্কা ও দুশ্চিন্তা থেকেই সিদ্ধান্ত নিই, জীবনের শেষ দিন আসার আগেই নিজ হাতে মানুষের সেবা করে যাব।" তিনি আরও জানান, সম্প্রতি তাঁর কিছু জমি ও দোকান সরকার কর্তৃক সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতায় অধিগ্রহণ করা হয়। সেখান থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ পাওয়া টাকার একটি বড় অংশ তিনি এই কাজের জন্য রেখে দেন। পুরো আয়োজন সম্পন্ন করতে তাঁর প্রায় ৯ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। রফিকুল ইসলামের ভাষায়, "অন্যে আমার মৃত্যুর পর দোয়া করবে কি না জানি না, কিন্তু নিজ হাতে পাঁচ হাজার মানুষকে খাইয়ে তাঁদের যে হাসি আর মুখভরা দোয়া পেয়েছি, তাতেই আমার জীবন সার্থক।"প্রথা ভাঙা এই আয়োজনের পরিকল্পনা রফিকুল ইসলাম বেশ কিছু দিন আগেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রচার করেছিলেন। প্রথম দিকে বিষয়টি সাধারণ মানুষের কাছে বেশ অদ্ভুত ঠেকলেও শুক্রবারের এই বিশাল ও সফল আয়োজনের পর পুরো হোসেনপুর উপজেলা ছাড়িয়ে দেশজুড়ে প্রশংসা কুড়াচ্ছে। রফিকুল ইসলামের চাচাতো ভাই মো. শামীম হোসেন আবেগপ্লুত হয়ে বলেন, "আমাদের এলাকায় তো বটেই, আমার জানা মতে পুরো দেশেই এমন দৃশ্য বিরল। মৃত্যুর পর স্বজনরা কীভাবে চল্লিশা করবে না-করবে তা নিয়ে সংশয় থাকে। কিন্তু জীবিত অবস্থায় হাজার হাজার মানুষকে ডেকে উৎসবমুখর পরিবেশে পেট পুরে খাওয়ানোর দৃশ্য আমাদের চোখ জুড়িয়ে দিয়েছে।"স্থানীয় জিনারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজহারুল ইসলাম রহিদ বলেন, "রফিকুল ইসলামের পরিবারের বাস্তবতা বিবেচনা করলে তাঁর এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও দূরদর্শী। সরকারি জমি অধিগ্রহণের টাকা কোনো অপচয় না করে তিনি যেভাবে অসহায় মানুষের মুখে খাবার তুলে দিলেন এবং পরকালের জন্য দোয়ার ব্যবস্থা করলেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।"সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই ঘটনার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনরা রফিকুল-বেগম দম্পতির প্রশংসায় পঞ্চমুখ। অনেকেই মন্তব্য করেছেন, "মৃত্যুর পর লোকদেখানো মেজবান বা চল্লিশা করার চেয়ে জীবিত অবস্থায় নিজের চোখে অসহায় মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার মতো আত্মতৃপ্তি আর কিছুতে হতে পারে না।"সামাজিক প্রথা ও লোকলজ্জার ঊর্ধ্বে উঠে রফিকুল ইসলাম ও বেগম আক্তার দম্পতির এই আত্মিক উপলব্ধি ও মানবিক ভোজের গল্প কেবল কিশোরগঞ্জের বীর হাজীপুর গ্রামেই নয়, বরং সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের চিন্তার জগতে এক নতুন দিক উন্মোচন করেছে।