ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

বেসরকারি স্কুলে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ কেন দিচ্ছে সরকার

দেশের বেসরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট মোকাবিলায় নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অভিজ্ঞ ও শারীরিকভাবে সক্ষম অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নিয়ে উপজেলাভিত্তিক ‘শিক্ষক পুল’ গঠনের নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই পুল থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী সাময়িকভাবে শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে পাঠদান কার্যক্রম সচল রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বহু বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক স্বল্পতা রয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে নতুন শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সময় লাগায় অনেক প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এসব সমস্যা সাময়িকভাবে সমাধান করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।নির্দেশনা অনুযায়ী, জেলা প্রশাসকদের তত্ত্বাবধানে উপজেলাভিত্তিক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক তালিকা তৈরি করা হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) পরামর্শে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটি, গভর্নিং বডি বা অ্যাডহক কমিটির অনুমোদন নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী এসব শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যাবে।এই শিক্ষকদের সম্মানী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিলের ‘অত্যাবশ্যকীয় খাত’ থেকে পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।তবে শিক্ষক সংকটের কারণ নিয়ে সরকারের সঙ্গে কিছুটা ভিন্নমত দিয়েছে এনটিআরসিএ। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি শুধু শিক্ষক সংকট বা নিয়োগে বিলম্বের কারণে নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানে এমপিওভুক্ত পদ খালি না থাকলেও অতিরিক্ত শিক্ষক প্রয়োজন হলে সেক্ষেত্রেও শিক্ষক পুল থেকে নিয়োগ দেওয়া যাবে।তিনি আরও দাবি করেন, এনটিআরসিএর শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অযথা বিলম্ব হয় না। নিয়মিত নিয়োগ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।তবে সরকারি তথ্য বলছে, দেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক শূন্যপদের সংখ্যা এখনও বড় উদ্বেগের বিষয়। গত ৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী জানান, সারাদেশে এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৬০ হাজার ২৯৫টি শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে।দেশে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩৪ হাজার ১২৯টি। গত জানুয়ারিতে এনটিআরসিএ ৬৭ হাজার ২০৮টি শিক্ষক ও প্রভাষক পদের বিপরীতে ১১ হাজার ৭১৩ জন প্রার্থীর নিয়োগ সুপারিশ করেছিল। এরপরও প্রায় ৫৫ হাজার ৪৯৫টি পদ শূন্য থেকে যায়।শিক্ষাবিদরা বলছেন, সংকটকালীন সময়ে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ কার্যকর হতে পারে। কারণ এসব শিক্ষক অভিজ্ঞ, শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনায় দক্ষ এবং দ্রুত দায়িত্ব নিতে সক্ষম। ফলে পাঠদান বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি কমবে।তবে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ঢাকার একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, তিন মাস বা স্বল্পমেয়াদি নিয়োগে কোর্স সম্পন্ন করা কঠিন হতে পারে। একজন শিক্ষক পড়ানো শুরু করে অন্য শিক্ষক মূল্যায়ন করলে শিক্ষার্থীদের জন্য জটিলতা তৈরি হতে পারে।খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. মাজহারুল হান্নান বলেন, সাময়িকভাবে এই উদ্যোগ ভালো। তবে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দলীয়করণ বা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হলে তা ক্ষতিকর হবে। এজন্য স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক পুল গঠন একটি বাস্তবসম্মত ধারণা। তবে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিল থেকে সম্মানী দেওয়ার সক্ষমতা নেই। বিশেষ করে গ্রামীণ ও আর্থিকভাবে দুর্বল স্কুলগুলো এতে সমস্যায় পড়তে পারে।বিশ্লেষকদের মতে, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ স্থায়ী সমাধান নয়, বরং অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা। দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত শিক্ষক নিয়োগ, দ্রুত এনটিআরসিএ প্রক্রিয়া সম্পন্ন, শূন্যপদ পূরণ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোই হবে টেকসই সমাধান।#আরএ

বেসরকারি স্কুলে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ কেন দিচ্ছে সরকার