ঘুমের যে সমস্যাগুলো ডিমেনশিয়ার প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে
ঘুমের ব্যাঘাতকে অনেকেই সাধারণ সমস্যা হিসেবে দেখেন। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, দীর্ঘমেয়াদি ঘুমের কিছু নির্দিষ্ট পরিবর্তন মস্তিষ্কের গুরুতর রোগ ডিমেনশিয়ার প্রাথমিক সংকেত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুম ও মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, এবং এই সম্পর্কের পরিবর্তন অনেক সময় স্নায়বিক অবক্ষয়ের পূর্বাভাস দেয়।ডিমেনশিয়া হলো একটি ছাতার মতো শব্দ, যা বিভিন্ন স্নায়বিক রোগের কারণে স্মৃতিশক্তি, চিন্তাশক্তি, আচরণ এবং দৈনন্দিন কার্যক্ষমতার ধীরে ধীরে অবনতি বোঝায়। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত রূপ হলো আলঝেইমার রোগ। চিকিৎসকদের মতে, এই রোগ শুধু স্মৃতি নয়, ঘুম-জাগরণের স্বাভাবিক ছন্দও প্রভাবিত করে।ইয়েল স্কুল অব মেডিসিনের নিউরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আরমান ফেশারাকি-জাদেহ বলেন, ঘুমের গঠনগত পরিবর্তন এবং ডিমেনশিয়ার মধ্যে সম্পর্ক এখন গবেষণায় স্পষ্টভাবে উঠে আসছে। বিশেষ করে গভীর ঘুম বা স্লো-ওয়েভ স্লিপ কমে গেলে মস্তিষ্কের বর্জ্য পরিষ্কার করার প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি বাড়ায়।ঘুমের সময় মস্তিষ্কের ‘গ্লিমফ্যাটিক সিস্টেম’ সক্রিয় থাকে, যা ক্ষতিকর প্রোটিনসহ বিভিন্ন বর্জ্য পদার্থ পরিষ্কার করে। এর মধ্যে অ্যামিলয়েড-বিটা নামের প্রোটিন ডিমেনশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। ঘুমের ছন্দ বিঘ্নিত হলে এই পরিষ্কার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়, ফলে মস্তিষ্কে ক্ষতিকর উপাদান জমতে পারে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু ঘুমের সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে তা সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এর মধ্যে অন্যতম হলো তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রা। হঠাৎ ঘুম না হওয়া, রাতে বারবার জেগে ওঠা এবং দিনে অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভব করা মস্তিষ্কের পরিবর্তনের ইঙ্গিত হতে পারে। আলঝেইমার রোগে মস্তিষ্কের ঘুম নিয়ন্ত্রণকারী অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই সমস্যা দেখা দেয়।আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো সার্কাডিয়ান রিদম বা শরীরের ঘুম-জাগরণ চক্রের ব্যাঘাত। স্বাভাবিক সময়ের বাইরে দিনে অতিরিক্ত ঘুমিয়ে পড়া এবং রাতে জেগে থাকা এই সমস্যার অংশ হতে পারে। এর সঙ্গে বিভ্রান্তি, অস্থিরতা এবং আচরণগত পরিবর্তনও দেখা দিতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘সানডাউনিং’ বলা হয়।র্যাপিড আই মুভমেন্ট (REM) স্লিপ বিহেভিয়ার ডিসঅর্ডারও ডিমেনশিয়ার সম্ভাব্য প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ অবস্থায় রোগীরা ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন অনুযায়ী অস্বাভাবিক আচরণ করেন—যেমন চিৎকার করা, লাথি মারা বা বিছানা থেকে উঠে যাওয়া। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি লিউই বডি ডিমেনশিয়া এবং পারকিনসনের প্রাথমিক পর্যায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।এছাড়া রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে ঘোরাঘুরি করা বা বিভ্রান্ত আচরণ করাও উদ্বেগজনক লক্ষণ হিসেবে ধরা হচ্ছে। এতে ঘুমের গুণগত মান কমে যায় এবং মস্তিষ্ক পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায় না। দীর্ঘ সময় এ অবস্থা চললে স্মৃতিশক্তি ও মানসিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমের সমস্যা থাকলেই ডিমেনশিয়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে এসব লক্ষণ দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহত থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে রোগের অগ্রগতি কিছুটা ধীর করা সম্ভব।স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, নিয়মিত ঘুমের রুটিন বজায় রাখা, স্ক্রিন টাইম কমানো, শারীরিক ব্যায়াম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ ঘুমের গুণগত মান উন্নত করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমের ধরনে পরিবর্তন স্বাভাবিক হলেও তা পর্যবেক্ষণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।সবশেষে বলা যায়, ঘুম শুধু বিশ্রামের বিষয় নয়, বরং মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। তাই ঘুমের অভ্যাসে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে তা অবহেলা না করে সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণই হতে পারে ভবিষ্যতের বড় ঝুঁকি এড়ানোর উপায়।#আরএ