ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

যুদ্ধ, কূটনীতি ও ক্ষমতার পুনর্গঠনে বিশ্বমঞ্চে আসিম মুনিরের উত্থান

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান উত্তেজনা প্রশমনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির আবারও আলোচনায়। সামরিক নেতৃত্ব, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে তিনি কীভাবে দ্রুত বৈশ্বিক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত হলেন, তা এখন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণের কেন্দ্রে।সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দিতে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে আসিম মুনির ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের অনুরোধের কথা উল্লেখ করেন। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়, ওয়াশিংটনের মতো শক্তিধর রাষ্ট্রও আঞ্চলিক সংকট ব্যবস্থাপনায় ইসলামাবাদের ভূমিকাকে গুরুত্ব দিচ্ছে।সূত্রগুলো বলছে, যুদ্ধবিরতির আগে পাকিস্তান ব্যাকচ্যানেল কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। আসিম মুনির সরাসরি মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। একই সময়ে ইরানের সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় রেখে দুই পক্ষের অবস্থানের দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করেন। পরে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের আলোচনার পরিবেশ তৈরিতেও পাকিস্তান ভূমিকা রাখে।বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে বড় মোড় ছিল ২০২৫ সালের ভারত–পাকিস্তান সামরিক উত্তেজনা। কাশ্মীরের পেহেলগামে হামলার ঘটনায় ভারত পাকিস্তানকে দায়ী করলে দুই দেশের মধ্যে চার দিনের সংঘাত শুরু হয়। পাল্টাপাল্টি হামলা, ড্রোন অভিযান ও সীমান্ত গোলাবর্ষণের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দেয়।সেই সংঘাতে পাকিস্তান সামরিকভাবে নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শন করে এবং দেশটির অভ্যন্তরে সেনাবাহিনীর অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়। সংঘাতের পরপরই আসিম মুনিরকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করা হয়। পাকিস্তানের ইতিহাসে আইয়ুব খানের পর তিনিই দ্বিতীয় ব্যক্তি যিনি এই মর্যাদা পান। তবে পূর্বসূরিদের তুলনায় তিনি একই সঙ্গে কার্যকর সেনাপ্রধান হিসেবেও বহাল থাকেন।এরপর পাকিস্তানের ক্ষমতার কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসে। পার্লামেন্টে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস (সিডিএফ) নামে নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীকে একক কমান্ড কাঠামোয় আনার ফলে আসিম মুনিরের ক্ষমতা আরও বিস্তৃত হয়। এতে তার মেয়াদও দীর্ঘায়িত হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। গত বছর ট্রাম্প প্রশাসনের আমন্ত্রণে হোয়াইট হাউসে তার বৈঠক ছিল আলোচিত ঘটনা। কোনো বেসামরিক নেতৃত্ব ছাড়াই একজন পাকিস্তানি সেনাপ্রধানের এমন আমন্ত্রণ বিরল হিসেবে দেখা হয়। বৈঠক শেষে ট্রাম্প তাকে “খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি” এবং “দুর্দান্ত যোদ্ধা” বলে উল্লেখ করেন।একই সময়ে পাকিস্তান সৌদি আরব, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র—এই তিন ভিন্ন শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশল নেয়। রিয়াদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, তেহরানের সঙ্গে সামরিক যোগাযোগ এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিরাপত্তা সমন্বয়—সব মিলিয়ে ইসলামাবাদ নিজেকে আঞ্চলিক সেতুবন্ধনকারী হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়।তবে আন্তর্জাতিক উত্থানের বিপরীতে দেশের ভেতরে পরিস্থিতি জটিল। বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখাওয়ায় সহিংসতা বেড়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান কারাগারে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। বিরোধীরা বলছে, সাংবিধানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতা অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে।তারপরও বর্তমান বাস্তবতায় আসিম মুনির পাকিস্তানের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। সামরিক শক্তি, কূটনৈতিক সক্রিয়তা এবং রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের সমন্বয়ে তিনি শুধু পাকিস্তানের রাজনীতিতেই নয়, বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে উঠেছেন।#আর

যুদ্ধ, কূটনীতি ও ক্ষমতার পুনর্গঠনে বিশ্বমঞ্চে আসিম মুনিরের উত্থান