রোগীর মৃত্যুতে উত্তপ্ত ভাগলপুর: জহুরুল ইসলাম মেডিকেলে নার্স রিমা আক্তারের ওপর হামলার প্রতিবাদে কিশোরগঞ্জে ফুঁসে উঠেছে নার্স সমাজ
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:
দায়িত্বপালনকালে পবিত্র পেশার নিয়োজিত এক নারী স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর বর্বরোচিত হামলা ও লাঞ্ছনার ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে কিশোরগঞ্জের গোটা নার্স সমাজ। গত সোমবার (২ নভেম্বর) বিকেলে বাজিতপুরের ভাগলপুরে অবস্থিত স্বনামধন্য জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক রোগীর মৃত্যুর অনভিপ্রেত ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার পারদ চড়ে বশে; যেখানে রোগীর স্বজনদের রূঢ় আচরণ ও বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে নৃশংস শিকার হন কর্তব্যরত সিনিয়র স্টাফ নার্স রিমা আক্তার। হাসপাতালের নিঝুম বারান্দা থেকে চিকিৎসালয়ের নিরাপত্তা বলয় পেরিয়ে এই হামলার তীব্র ঢেউ আছড়ে পড়ে পুরো জেলায়। এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার (৪ নভেম্বর) সকাল দশটা ও দুপুর ১২টায় বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশন (বিএনএ) কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার উদ্যোগে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল প্রাঙ্গণে দুটি পৃথক ও অভাবনীয় মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। শীতের সকালের কুয়াশা ভেদ করে প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন হাতে শত শত নার্স ও চিকিৎসা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা রাজপথে নেমে আসেন। উত্তাল এই মানববন্ধন থেকে স্বাস্থ্যসেবার দুর্গকে সুরক্ষিত রাখা এবং কর্মক্ষেত্রে নার্সদের জীবন বাজি রেখে কাজ করার স্বীকৃতিস্বরূপ অবিলম্বে হামলাকারীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তির দাবি উচ্চারিত হয়। মানববন্ধনে বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, চিকিৎসালয়ের মতো একটি সংবেদনশীল স্থানে যেখানে মানুষের জীবন বাঁচানোর লড়াই চলে, সেখানে চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান কান্ডারি একজন নার্সের গায়ে হাত তোলার দুঃসাহস কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
ঘটনার পটভূমি বিশ্লেষণে জানা যায়, গত সোমবার বিকেলে ভাগলপুরের জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিছানায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক রোগীর আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। প্রিয়জনকে হারানোর শোকে মুহ্যমান স্বজনদের আবেগ ও উত্তেজনা একপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং তা রূপ নেয় সংঘাতে। রোগীর মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র স্টাফ নার্স রিমা আক্তারের সঙ্গে স্বজনদের তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি এতটাই ঘোলাটে হয়ে ওঠে যে, শান্ত করার সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ওই নার্সের ওপর শারীরিক হামলা চালানো হয়। শুধু রিমা আক্তার একাই নন, এই ন্যক্কারজনক ও আকস্মিক হামলায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে হাসপাতালের একজন নিরাপত্তাকর্মীও মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন বলে জোরালো অভিযোগ পাওয়া গেছে। এহেন আকস্মিক ও কাপুরুষোচিত আক্রমণে পুরো হাসপাতাল চত্বরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জীবনের চরম ঝুঁকি ও চরম মানসিক চাপ মাথায় নিয়ে যারা ২৪ ঘণ্টা রোগীর শিয়রে সেবা দিয়ে যান, তাঁদের ওপর এমন প্রকাশ্য হামলা শুধু রিমা আক্তার নামের একজন ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়, বরং এটি সমগ্র চিকিৎসা পেশা ও মানবতার ওপর এক নগ্ন থাবা। এই ঘটনার পর থেকেই কিশোরগঞ্জের প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত নার্সদের মনে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও গভীর উৎকণ্ঠা দানা বাঁধতে শুরু করে, যা শেষ পর্যন্ত একটি বড় প্রতিবাদী বিস্ফোরণের রূপ নেয়।
বুধবারের এই মানববন্ধনে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় পরিষদের বিশিষ্ট নেতা আব্দুল্লাহ আল মামুন অত্যন্ত জোরালো ও আবেগঘন কন্ঠে বলেন, দায়িত্বপালনরত অবস্থায় একজন নার্সের ওপর হামলার ঘটনা কেবল নিন্দনীয়ই নয়, এটি অত্যন্ত লজ্জাজনকও বটে। নার্সরা নিজেদের জীবনের মায়া ত্যাগ করে, পরিবারের কথা ভুলে প্রতিনিয়ত রোগীদের সেবা করে যাচ্ছেন। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, আজ কর্মক্ষেত্রে তাঁদের নিজেদের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এ ধরনের অমানবিক ঘটনা শুধু নার্সেদের মনে গভীর নিরাপত্তাহীনতাই তৈরি করে না, বরং দেশের সার্বিক চিকিৎসাসেবার পবিত্র পরিবেশ ও গতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে।
একই সুরে প্রতিবাদের আগুন জ্বেলে বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশন কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার সম্মানিত সভাপতি মো. কামরুল হাসান তাঁর বক্তব্যে বলেন, একজন নার্সের ওপর হামলা পুরো নার্স সমাজের নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের প্রাণ বাঁচানোর কারিগরদের ওপর এ ধরনের হামলা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা যায় না। অবিলম্বে ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে এই হামলায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সব অপরাধীকে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে এবং জনসমক্ষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার চাকা স্তব্ধ করে দিতে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। একই সঙ্গে তিনি দেশের প্রতিটি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নার্সদের জন্য শতভাগ নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান।
প্রতিবাদমুখর এই বিশাল মানববন্ধনে আরও বক্তব্য রাখেন সংগঠনের কোষাধ্যক্ষ মো. আব্দুল্লাহ আল মতিন, সৈয়দা নাফিসা ইসলাম নার্সিং কলেজের শ্রদ্ধেয় অধ্যক্ষ নীলিমা রানী বর্মণ এবং সেবা তত্ত্বাবধায়ক মঞ্জুশ্রী সরকার প্রমুখ। বক্তারা প্রত্যেকেই নার্সদের পেশাগত সম্মান ও নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনে বলেন, একজন চিকিৎসক বা নার্স যখন হাসপাতালে আসেন, তখন তাঁরা কোনো বিশেষ ব্যক্তি নন; তাঁরা গোটা জাতির সুস্থতার অতন্দ্র প্রহরী। তাই প্রহরীকেই যদি অরক্ষিত ও আক্রান্ত রাখা হয়, তবে সাধারণ মানুষ কার কাছে নিরাপদ আশ্রয় পাবে? এই প্রশ্ন আজ কিশোরগঞ্জের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের মুখে মুখে ঘুরপাক খাচ্ছে।
দিনভর চলা এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া সাধারণ নার্সদের চোখে-মুখে ছিল গভীর ক্ষোভ আর প্রতিবাদের অনির্বাণ শিখা। তাঁদের মতে, হাসপাতালের মতো একটি পবিত্র ও জীবনরক্ষাকারী স্থানে যদি নিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিশ্চিত না করা যায়, তবে দেশের স্বাস্থ্য খাত অচিরেই এক গভীর অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে। জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো একটি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানে ঘটা এই অনভিপ্রেত ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার এবং দোষীদের কঠোর শাস্তি কেবল রিমা আক্তারের প্রতি ন্যায়বিচারই প্রতিষ্ঠা করবে না, বরং তা সারা দেশের লাখো নার্সকে তাঁদের মহান পেশাগত দায়িত্ব পালনে নতুন করে সাহস ও নিরাপত্তা জোগাবে। কিশোরগঞ্জের স্বাস্থ্যঙ্গনে বর্তমানে একটাই দাবি—খুনি বা হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং একটি নিরাপদ, ভীতিহীন ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ।
