ঐতিহাসিক বিপ্লব ও সংহতি দিবসে কিশোরগঞ্জে তারুণ্যের দীপ্তি ও রাজনৈতিক ঐক্যের অনন্য মেলবন্ধন।

07 Nov 2026, 16:29 · সৈয়দ মইনুল হোসেন


নভেম্বরের হিমেল বাতাসে তখনো ভোরের কুয়াশা পুরোপুরি কাটেনি। তবে তার আগেই ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর উপলক্ষে উত্তাল ও মুখরিত হয়ে ওঠে কিশোরগঞ্জ জেলা শহর। ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লব ও সংহতি দিবস কেবল একটি রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারের পাতা নয়; এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন এবং জাতীয় ঐক্যের এক অবিনাশী আলোকবর্তিকা। দীর্ঘ রাজনৈতিক পটপরিক্রমা ও মতাদর্শের ভিন্নতা সত্ত্বেও এই মহান দিনটিকে কেন্দ্র করে কিশোরগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে যে দৃশ্যপট রচিত হলো, তা কেবল একটি সাধারণ আলোচনা সভা বা আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডিতে আটকে থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছিল একাত্তরের চেতনা ও নব্বইয়ের উত্তরণ পেরিয়ে এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নসন্ধানী মিলনমেলা।

​মূল আলোচনাসভার আগে জেলা বিএনপি ও এর সকল অঙ্গ-সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত বর্ণাঢ্য ও বিশাল শোভাযাত্রাটি ছিল এই আয়োজনের প্রাণকেন্দ্র। সকাল থেকেই জেলার বিভিন্ন উপজেলা, ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড পর্যায় থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা শহরের প্রধান সড়কগুলোতে সমবেত হতে থাকেন। দলীয় রঙ-বেরঙের ব্যানার, ফেস্টুন, আর জাতীয় পতাকায় ছেয়ে যায় চারপাশ। ​শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করার সময় মিছিলটির দীর্ঘ সারি যেন এক বহতা নদীর রূপ নেয়। তরুণ নেতাকর্মীদের চোখেমুখে ছিল এক অপ্রতিরোধ্য উদ্দীপনা, আর প্রবীণদের কণ্ঠে ছিল ইতিহাসের সোনালী দিনের স্মৃতিচারণ। শোভাযাত্রাটি যখন শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় পেরিয়ে জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে এসে শেষ হয়, তখন পুরো চত্বরটি এক মোহনীয় জনসমুদ্রে রূপ নেয়। এই শোভাযাত্রা কেবল শক্তির প্রদর্শন ছিল না, বরং এটি ছিল জনমানুষের মনের গভীরে জমে থাকা অধিকার আদায়ের প্রতিধ্বনি।

​শোভাযাত্রার পর জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান—আলোচনা সভা এবং কৃতি শিক্ষার্থীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণী। মিলনায়তনের ভেতরে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। নেতাকর্মীদের সরব উপস্থিতি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মননশীল অংশগ্রহণ এবং গণমাধ্যমকর্মীদের সরব তৎপরতা পুরো আয়োজনটিকে এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছিল।

​অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কিশোরগঞ্জ জেলার সুযোগ্য জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন। তাঁর সাবলীল ও দিকনির্দেশনামূলক সঞ্চালনা এবং সময়োপযোগী বক্তব্য পুরো অনুষ্ঠানকে এক সুশৃঙ্খল কাঠামোর ওপর দাঁড় করায়।

​অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) আসনের সংসদ সদস্য মোঃ মাজহারুল ইসলাম। তাঁর বক্তব্যে ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক পটভূমি ও বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের গভীর মেলবন্ধন ফুটিয়ে তোলা হয়। তিনি বলেন, "৭ নভেম্বর আমাদের জাতীয় জীবনের এমন এক সন্ধিক্ষণ, যা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করার শপথ নেওয়ার দিন। মতের অমিল থাকতে পারে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থে এবং জনকল্যাণে আজ আমাদের ইস্পাতদৃঢ় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।"

​বিশেষ অতিথির আসনে ছিলেন জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ খান সোহেল। জেলা পুলিশ সুপার তাঁর বক্তব্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসনের দৃঢ় অবস্থান এবং সকলের সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অন্যদিকে, জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ খান সোহেল তাঁর সুচিন্তিত বক্তব্যে কিশোরগঞ্জের উন্নয়ন ও স্থানীয় সম্প্রীতির ওপর আলোকপাত করে বলেন, "ঐতিহাসিক চেতনাকে ধারণ করেই আমাদের জনপদের প্রতিটি মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে হবে। বিভেদ ভুলে উন্নয়নের স্বার্থে সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে।"

​এই আয়োজনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি ছিল এর অন্তর্ভুক্তি বা ইনক্লুসিভনেস। অনুষ্ঠানে শুধু একটি নির্দিষ্ট দলের গণ্ডি পেরিয়ে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজের বিশিষ্ট প্রতিনিধিরা এবং বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকগণ অংশ নেন।

​মিলনায়তনের সামনের সারিতে বসে যখন বিভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা একে অপরের সাথে করমর্দন করছিলেন এবং হাসিমুখে কুশল বিনিময় করছিলেন, তখন উপস্থিত সাধারণ মানুষ এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির আভাস পাচ্ছিল। বক্তারা বারবার এই ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলেন, গণতন্ত্রের মূল সৌন্দর্যই হলো মতের বহুমুখিতা, কিন্তু দেশের স্বার্থে, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে সবাইকে এক মোহনায় মিলিত হতে হয়। ৭ নভেম্বরের আদর্শই আজ সেই মিলনের সেতু হিসেবে কাজ করেছে।

​আলোচনা সভার পাশাপাশি অনুষ্ঠানটির অন্যতম আকর্ষণ ছিল প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণী পর্ব। জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও তরুণ সমাজ বিপ্লব ও সংহতি দিবসকে কেন্দ্র করে আয়োজিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল।

​প্রধান অতিথি ও অন্যান্য বিশিষ্ট অতিথিবৃন্দ যখন একে একে বিজয়ীদের হাতে ক্রেস্ট, সনদপত্র ও পুরস্কার তুলে দিচ্ছিলেন, তখন কিশোরগঞ্জের তরুণদের চোখের তারায় ঝিলিক দিয়ে উঠছিল আগামী দিনের সোনালী সম্ভাবনা। শিশুদের হাসি আর তরুণদের করতালি পুরো মিলনায়তনকে এক উৎসবমুখর আবহে ভরিয়ে তোলে। এই পুরস্কার বিতরণী কেবল মেধার মূল্যায়ন ছিল না, বরং এটি ছিল আগামী দিনের দেশ গড়ার কারিগরদের প্রতি এক বিশেষ আস্থার প্রতীক।

​বিশ্লেষকদের মতে, কিশোরগঞ্জের আজকের এই আয়োজনটি কেবল একটি বার্ষিক রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যবহ। বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে চলা বাংলাদেশে যখন জনমানুষের মনে নানা প্রশ্ন ও প্রত্যাশা ঘুরপাক খাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে কিশোরগঞ্জের এই অনুষ্ঠানটি একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।

​প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং সুশীল সমাজের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, বিভাজনের দেওয়াল ভেঙে সম্প্রীতির সেতু নির্মাণ অসম্ভব নয়। জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিনের দক্ষ নেতৃত্ব, সংসদ সদস্য মোঃ মাজহারুল ইসলামের সুদূরপ্রসারী বক্তব্য এবং স্থানীয় নেতৃবৃন্দের উপস্থিতি কিশোরগঞ্জের রাজনীতিতে এক পরিপক্ব ও সহনশীল সংস্কৃতির জন্ম দিচ্ছে।

​দিন শেষে যখন শিল্পকলা একাডেমির আলো ধীরে ধীরে নিভে আসছিল এবং নেতাকর্মীরা নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাচ্ছিলেন, তখনো বাতাসে যেন ভাসছিল একটি স্নিগ্ধ প্রত্যয়। ৭ নভেম্বরের চেতনায় উজ্জীবিত কিশোরগঞ্জ জেলা যেন আজ নতুন এক অভিযাত্রার সূচনালগ্নে দাঁড়িয়ে—যেখানে সংঘাত নয়, সংহতিই হোক আগামীর পথচলার একমাত্র সম্বল।