নওগাঁর মান্দা উপজেলার ১১নং কালিকাপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. আশরাফুল ইসলাম বাবুকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে এ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
গত ১ নভেম্বর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের ইউপি-১ শাখা থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সিনিয়র সহকারী সচিব আতিফুল ইসলামের স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে তাঁকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড ইউনিয়ন পরিষদ ও জনস্বার্থের পরিপন্থী হওয়ায় স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
এদিকে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ করে আসছিলেন পরিষদের সদস্যসহ স্থানীয়দের একটি অংশ। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ, ভিজিডি ও ভিজিএফের চাল আত্মসাৎ, মাদক কারবারিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া, মাদকসেবীদের আটকে রেখে জরিমানার নামে অর্থ আদায় এবং সালিশ-বিচারের নামে অর্থ বাণিজ্য।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকসেবীদের ধরে এনে ইউনিয়ন পরিষদে আটকে রেখে মোটা অঙ্কের জরিমানা আদায় করা হতো। নারীঘটিত বিরোধের সালিশ-বিচারেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এ ছাড়া বিচারকার্য পরিচালনার নামে পক্ষপাতমূলক আচরণ, সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক ব্যবহার ও অশালীন ভাষা প্রয়োগের অভিযোগও করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।
অন্যের জমি জোরপূর্বক লিজ নিয়ে সেখানে ইটভাটা নির্মাণ করলেও চুক্তি অনুযায়ী জমির মালিককে লিজের টাকা পরিশোধ না করার অভিযোগও রয়েছে। পাশাপাশি দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ।
অন্যদিকে, কালিকাপুর ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত সদস্যরা চার বছরের বেশি সময় ধরে সম্মানীভাতা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন। তাঁদের দাবি, প্রত্যেক সদস্যের দুই লাখ টাকার বেশি সম্মানীভাতা বকেয়া রয়েছে। একই সঙ্গে সদস্যদের সম্পৃক্ত না করে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিযোগও রয়েছে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইউনিয়ন পরিষদের নয়জন সদস্য গত বছরের ২৪ নভেম্বর মান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে সম্মানীভাতা না পাওয়া, উন্নয়ন প্রকল্পে সম্পৃক্ত না করা এবং বিভিন্ন অনিয়মের বিষয় তুলে ধরা হয়।
এরপর গত ২০ আগস্ট উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত শুরু হয়। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আল মাসুদ রানা ইউপি সদস্যদের লিখিত বক্তব্য গ্রহণ করেন। পাশাপাশি পরিষদের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব চেয়ে চেয়ারম্যানের কাছে তথ্য চাওয়া হয়।
ইউপি সদস্য নাজিম উদ্দিন মোল্লা বলেন, নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তিনি সম্মানীভাতা হিসেবে মাত্র ৩০ হাজার টাকা পেয়েছেন। তাঁর ওয়ার্ডে তাঁকে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ দেওয়া হয়নি। অন্য সদস্যদের দিয়ে তাঁর ওয়ার্ডে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এমনকি শীতার্ত মানুষের মধ্যে বিতরণের জন্য কোনো কম্বলও তিনি পাননি।
আরেক সদস্য গোলাম মোস্তফা বলেন, এ পর্যন্ত সম্মানীভাতা হিসেবে তিনি পেয়েছেন মাত্র ৪০ হাজার টাকা। বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিবাদ করায় তাঁর ভাগ্যে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প জোটেনি।
ইউপি সদস্য ইউনুস আলী সরদার বলেন, বিভিন্ন প্রকল্পে সদস্যদের সভাপতি করা হলেও প্রকল্পের কাজ সম্পর্কে তাঁদের কিছুই জানানো হয় না। শুধু কাগজপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পরে চেয়ারম্যান নিজেই বিল উত্তোলন করেন। এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করায় তাঁদের সম্মানীভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলাম বাবু বলেন, হোল্ডিং ট্যাক্স ও ট্রেড লাইসেন্স থেকে পাওয়া অর্থ ছাড়া পরিষদের তেমন কোনো আয় নেই। প্রতিবছর পরিষদের আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়ায় সদস্যদের সম্মানীভাতা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি।
মান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোছা. আতিয়া খাতুন বলেন, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে তিনি চেয়ারম্যানের সাময়িক বরখাস্তের চিঠি পেয়েছেন। সেবাপ্রত্যাশীরা যাতে কোনো ধরনের ভোগান্তির শিকার না হন, সে জন্য দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মান্দায় অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে কালিকাপুর ইউপি চেয়ারম্যান বাবু সাময়িক বরখাস্ত
05 Nov 2026, 19:32 · এম এ মতিন — Manda Upazila Correspondent
