কে এই সামান্তা শারমিন? জুলাই আন্দোলন থেকে এনসিপি, পদত্যাগের কারণ কী?

05 Nov 2026, 19:41 · বিশেষ প্রতিনিধি — উন্নয়নে বাংলাদেশ

জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা আলোচিত রাজনৈতিক মুখ সামান্তা শারমিন। জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখপাত্র থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শীর্ষ নেতৃত্বে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই দল থেকেই এবার পদত্যাগ করলেন এই নারী নেত্রী। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া দীর্ঘ বিবৃতিতে দল ছাড়ার ঘোষণা দেন তিনি।কেন হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত? জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক জোট, নির্বাচনী কৌশল, নারী নেতৃত্বের অবস্থান এবং দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র—এই চারটি বিষয়কে পদত্যাগের প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন সামান্তা শারমিন। তাঁর এই সিদ্ধান্তের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ও এনসিপির সঙ্গে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য। 

কে এই সামান্তা শারমিন?

সামান্তা শারমিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সাবেক শিক্ষার্থী। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিতি পান।
২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় নাগরিক কমিটি আত্মপ্রকাশ করলে সংগঠনটির মুখপাত্রের দায়িত্ব পান তিনি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন, রাষ্ট্র সংস্কার এবং নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছিল সংগঠনটি।
২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নাগরিক পার্টির আত্মপ্রকাশের সময় দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পান সামান্তা শারমিন।
নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ জুলাই আন্দোলন থেকে উঠে আসা নেতাদের সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে যুক্ত হন তিনি। তবে সময়ের সঙ্গে দলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে তাঁর মতপার্থক্য প্রকাশ্যে আসতে থাকে। জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে বিরোধ
সামান্তা শারমিনের পদত্যাগের অন্যতম প্রধান কারণ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির রাজনৈতিক জোট।
নিজের ফেসবুক বিবৃতিতে তিনি জানান, প্রায় এক বছর আগে থেকেই এই জোটের বিরোধিতা করে আসছিলেন। তাঁর মতে, এনসিপি যে রাষ্ট্র সংস্কার ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, জামায়াতের সঙ্গে জোট সেই লক্ষ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
এটি সামান্তা শারমিনের রাজনৈতিক মূল্যায়ন। জোটের বিষয়ে তাঁর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দলের রাজনৈতিক কৌশল ও আদর্শিক অবস্থানের প্রশ্নও সামনে এসেছে।  বড় দলের সঙ্গে নির্বাচনী জোট নিয়েও আপত্তি

২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এনসিপির অংশগ্রহণের কৌশল নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সামান্তা শারমিন।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপির সামনে স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রেখে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট করার কারণে সেই স্বাতন্ত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

দলের ভেতরে বিকল্প রাজনৈতিক কৌশল ও প্রস্তাব তুলে ধরলেও সেগুলো যথাযথ গুরুত্ব পায়নি বলেও দাবি করেন তিনি। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস। নারী নেতৃত্বের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন

পদত্যাগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের বিষয়টি সামনে এনেছেন সামান্তা শারমিন।

তাঁর অভিযোগ, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও পরবর্তী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাঁদের প্রত্যাশিত অবস্থান নিশ্চিত করা হয়নি।

তিনি মনে করেন, নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নারীদের মর্যাদাপূর্ণ অংশগ্রহণের যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, এনসিপি তা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারেনি।

তবে নারীদের অংশগ্রহণ ও দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে তাঁর অভিযোগের বিষয়ে এনসিপির আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যাও গুরুত্বপূর্ণ। চ্যানেল এস । নতুন কমিটিতে পদমর্যাদা কমে যাওয়ার পর আলোচনা

গত ২৩ অক্টোবর এনসিপির পুনর্গঠিত কমিটিতে সামান্তা শারমিনকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়কের পরিবর্তে যুগ্ম আহ্বায়ক পদে রাখা হয়।

এই পরিবর্তনকে তাঁর পদাবনতি হিসেবে উল্লেখ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়।

তবে পদত্যাগের বিবৃতিতে সামান্তা শারমিন শুধু পদমর্যাদার বিষয়টি নয়, কাউন্সিল ছাড়াই কমিটি পুনর্গঠন এবং দলের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ঘাটতির অভিযোগও তুলে ধরেছেন। প্রায় এক বছরের মতপার্থক্যের অবসান

সামান্তা শারমিন জানিয়েছেন, গত ১১ মাস ধরে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ, প্রস্তাব ও আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক মতপার্থক্য নিরসনের চেষ্টা করেছেন।

কিন্তু তাঁর মূল্যায়ন অনুযায়ী, এনসিপি প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শ ও মূল্যবোধের প্রতি যথাযথভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকতে পারেনি। এ কারণেই তিনি দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

পদত্যাগের পরও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজনৈতিকভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তিনি। একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে আগ্রহীদের তাঁর সঙ্গে মতবিনিময়ের আহ্বান জানিয়েছেন।  এবার কোন পথে সামান্তা শারমিন?

এনসিপি ছাড়লেও সামান্তা শারমিন রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেননি। বরং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক উদ্যোগে যুক্ত থাকার ইচ্ছা জানিয়েছেন।

তবে তিনি নতুন কোনো রাজনৈতিক দল গঠন করবেন, অন্য কোনো দলে যোগ দেবেন, নাকি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে এগোবেন—এ বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট ঘোষণা পাওয়া যায়নি।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে জাতীয় নাগরিক কমিটি, সেখান থেকে এনসিপির নেতৃত্ব এবং শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ—সামান্তা শারমিনের রাজনৈতিক পথচলার এই পরিবর্তন বাংলাদেশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতিতে মতাদর্শ, জোটনীতি ও দলীয় গণতন্ত্র নিয়ে চলমান বিতর্কের একটি নতুন অধ্যায় হয়ে উঠেছে।